তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ও ক্যানসারের কারণ খুঁজতে অস্ট্রেলিয়ায় এক লাখ মানুষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা

অস্ট্রেলিয়ায় এক লাখ মানুষকে নিয়ে শুরু হচ্ছে দেশটির সবচেয়ে বড় আন্তপ্রজন্ম সুস্থতা ও বার্ধক্য গবেষণা। ‘১৮ অ্যান্ড আপ’ নামের এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের নিয়োগের কাজ শুরু করেছে স্বাধীন ও অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্যাক্স ইনস্টিটিউট। বৃহস্পতিবার গবেষণাটি চালু করা হয়।
গবেষণায় ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী মানুষদের সারা জীবন ধরে পর্যবেক্ষণ করা হবে। গবেষকদের আশা, এর মাধ্যমে তরুণদের বড় স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর কারণ আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে, যার মধ্যে রয়েছে মানসিক অসুস্থতা এবং বাড়তে থাকা ক্যানসারের হার।
এই গবেষণার আগের ধাপ ‘৪৫ অ্যান্ড আপ’ শুরু হয়েছিল দুই দশক আগে। সেটি এখন দক্ষিণ গোলার্ধের সবচেয়ে বড় জনসংখ্যাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, যাতে ৪৫ বছর থেকে ১০০ বছরের বেশি বয়সী ২ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন।
৪৫ অ্যান্ড আপ গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বারবার জরিপ করা হয়েছে এবং তাদের উত্তর অন্যান্য তথ্যভান্ডারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তা থেকে ধূমপান, ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে হৃদরোগের ফলাফলের পার্থক্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
১৮ অ্যান্ড আপের বৈজ্ঞানিক পরিচালক অ্যাডজাংক্ট অধ্যাপক জাস্টিন গ্যাট বলেছেন, তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি তথ্যের ঘাটতি রয়েছে; বিদ্যমান গবেষণাগুলো প্রায়ই গবেষকদের শুধু কোনো এক মুহূর্তের চিত্র দেয়।
স্নায়ুবিজ্ঞানী ও মানসিক স্বাস্থ্য গবেষক গ্যাট বলেন, ‘গত এক বছরে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয়দের প্রায় প্রতি পাঁচজনের মধ্যে দুজন কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগেছেন, এবং সেই সংখ্যা বাড়ছে। অথচ এর কারণ বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি প্রমাণ আমাদের হাতে এখনো নেই।’
গবেষণা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ায় ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ আত্মহত্যা। প্রতিরোধের উদ্যোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা উন্নত করতে এর পেছনের কারণগুলো বোঝা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
৪৫ অ্যান্ড আপ গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নতুন গবেষণায় অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হবে। গ্যাটের মতে, এতে বোঝা যাবে পারিবারিক ইতিহাস, জীবনের অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থার জটিল মিশ্রণ কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে।
স্যাক্স ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী ড. মার্টিন ম্যাকনামারা বলেছেন, মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি ক্যানসার নিয়ে প্রশ্নগুলোও প্রাথমিক জরিপের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।
২০০০ সালের পর থেকে অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাথমিক বয়সে ক্যানসার ধরা পড়ার ঘটনা বেড়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে ৫০ বছর বয়সের আগে ধরা পড়া ক্যানসারকেই এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক বয়সের ক্যানসার বলা হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে অন্ত্র, থাইরয়েড ও স্তনের ক্যানসার।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বেশি হারে স্ক্রিনিং, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং জীবনের শুরুর দিকে ও তরুণ বয়সে ঝুঁকির নানা উপাদানের সংস্পর্শ এর পেছনে থাকতে পারে। তবে এসব প্রভাব আরও ভালোভাবে বুঝতে জরুরি গবেষণার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রা, সামাজিক অবস্থা ও পটভূমি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। তাদের সম্মতিতে এসব তথ্য ক্যানসার রেজিস্ট্রি ও মেডিকেয়ারের মতো অন্যান্য স্বাস্থ্য রেকর্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
ম্যাকনামারা বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে মানুষকে অনুসরণ করা জরুরি, যাতে আমরা আমাদের স্বাস্থ্য ও সেবা ব্যবস্থা ঠিক করা ও পুনর্গঠনের উপায় বের করতে পারি।’ তিনি বলেন, এতে অংশগ্রহণকারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বসবাসের জায়গাসহ তাদের জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।
গবেষণাটি অংশগ্রহণকারীদের বয়স অনুযায়ী প্রশ্ন নিয়ে এগিয়ে যাবে এবং নতুন স্বাস্থ্য সমস্যা বা মহামারির বিষয়ও এতে যুক্ত হবে। ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের ৪৫ লাখ ডলারের অনুদানে গবেষণাটি চলবে; নভেম্বর থেকে অংশগ্রহণকারী নিয়োগ শুরু হবে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মহামারিবিদ্যা ও জনস্বাস্থ্যের অধ্যাপক এমিলি ব্যাংকস, যিনি স্যাক্স ইনস্টিটিউটের সাবেক বৈজ্ঞানিক পরিচালক, ৪৫ অ্যান্ড আপের তথ্য ব্যবহার করে ২০২৫ সালে দেখিয়েছিলেন ধূমপানজনিত অসুস্থতায় প্রতিদিন ৬৬ জন অস্ট্রেলীয় মারা যান, যা আগের ধারণার চেয়ে বেশি। ব্যাংকস বলেছেন, বড় আকারের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা শক্তিশালী, কারণ এগুলো গবেষকদের জনসংখ্যার ভেতরে দেখার সুযোগ দেয়। বিশ্বজুড়ে ৮০০-র বেশি গবেষক ৪৫ অ্যান্ড আপের তথ্য ব্যবহার করেছেন।




