চার দিনের জাপান সফর শেষে টোকিও ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, ছয় দলিল ও ১৭ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

জাপানে চার দিনের সরকারি সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার উদ্দেশে টোকিও ত্যাগ করেছেন। সফরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, প্রধানমন্ত্রী, তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৪৪ মিনিটে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে তারেক রহমানের এই সফরে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর, বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে জাপানি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শন অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গত ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে তারেক রহমান ও তাকাইচি দুই দেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্ব জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়।
দুই নেতা বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা করেন। এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে জাপানের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়েও তাঁরা আলোচনা করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাংলাদেশ ও জাপান ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দলিলে স্বাক্ষর করেছে। পাশাপাশি ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ইয়েনের দুটি ঋণ প্রকল্পের প্রতিশ্রুতিও পাওয়া গেছে। ঋণ প্রকল্প দুটি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।
স্বাক্ষরিত দলিলগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদারে একটি টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ইয়েন বা ১ কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলারের অনুদান চুক্তি। এ ছাড়া ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন, কৃষি, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সহযোগিতার জন্যও একটি অভিপ্রায়পত্র স্বাক্ষর করা হয়েছে।
সরকারি পর্যায়ের চুক্তির পাশাপাশি জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) আয়োজনে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
গত ২৮ অক্টোবর টোকিওতে জেট্রোর সদর দপ্তরে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি জাপানি কোম্পানিগুলোকে পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। খাতগুলো হলো মোটরগাড়ি উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ, দ্রুতগতির রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ। প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিনিয়োগকারীদের সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেন।
সফরকালে তারেক রহমান জাপানের রাজনৈতিক নেতা, উন্নয়ন সহযোগী ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়া এবং জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকা। ইউনিক্লো, মিতসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন ও জেইআরএসহ জাপানের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠকে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়।
গত ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী জাপানের ফুতসুতে জেইআরএ'র তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ইচিকাওয়ায় নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন। আজ তিনি নাগোয়া সফর করেন; সেখানে টয়োটা মোটর করপোরেশনের মোটোমাচি কারখানা এবং টয়োটা কমেমোরেটিভ মিউজিয়াম অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি পরিদর্শন করেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে প্রথমবারের মতো অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের পর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর অনুষ্ঠিত হলো। জাপান দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী; দেশটি ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে সহায়তা দিয়ে আসছে।
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সফরে জাপান গিয়েছিলেন তারেক রহমান। সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল।




