যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে এসআরবির অভিযানের সময় গুলিতে কারখানাশ্রমিক মারুফ নিহত, প্রাণঘাতী গুলি কার—প্রশ্নের জবাব মেলেনি
‘তাড়াতাড়ি রান্না করো, অনেক ক্ষুধা লেগেছে। আমি আসছি’—স্ত্রী মীম আক্তার রুনাকে এ কথা বলে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন কারখানাশ্রমিক মারুফ ওরফে দুখু মিয়া। কিছুক্ষণ পর খবর আসে, তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এরপর আর বাড়ি ফেরা হয়নি তাঁর। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মারুফ। ওই সময় এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে ছিলেন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদস্যরা।
অভিযানের সময় গোলাগুলি ও এক তরুণের মৃত্যু ঘটলেও প্রাণঘাতী গুলিটি কার অস্ত্র থেকে বেরিয়েছিল, তা নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। এসআরবি কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁদের সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে আকাশের দিকে চারটি ফাঁকা গুলি ছুড়েছিলেন। নিহতের স্বজনেরা বলছেন, গোলাগুলির শব্দ শুনে বাইরে দেখতে গিয়েছিলেন মারুফ; দুই পক্ষের ‘ঝামেলা’ দূর থেকে দেখার সময়ই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। তবে কারা গুলি করেছে, সেটি তাঁরা বলতে পারছেন না।
ঘটনাটি ঘটে ধলপুর ওয়াসা গেটসংলগ্ন সিটি পল্লি এলাকায়, যা স্থানীয়ভাবে আউটফল ও তেলেগু কলোনি নামেও পরিচিত। এলাকার ভেতরের রাস্তা সরু ও ভাঙাচোরা; কোনো কোনো পথ দিয়ে পাশাপাশি দুজন মানুষের চলাচলও কঠিন। সেখানে রয়েছে অর্ধনির্মিত ও পরিত্যক্ত কয়েকটি ভবন, যেগুলোর চারপাশে অন্ধকার ও আড়াল তৈরি হয়েছে। ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সামি বলেন, এলাকাটিতে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করা কঠিন, অনেক স্থানে হেঁটে যেতে হয়; সেখানে একটি পরিত্যক্ত চারতলা ভবন রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে মাদকসেবীরা ব্যবহার করেন।
এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ধলপুরের ওই এলাকায় মাদক কারবারিদের বড় একটি চক্র রয়েছে এবং সেখানে আগে থেকেই তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছিল। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দুটি মোটরসাইকেলে সাদা পোশাকে চার সদস্যের একটি দল এলাকায় যায়। তাঁর ভাষ্য, দলটি প্রথমে তথ্য সংগ্রহ বা রেকি করতে গিয়েছিল; কিন্তু সেখানে মাদকদ্রব্য দেখতে পেয়ে চারজনকে আটক করার চেষ্টা করে। ঘটনাস্থলে ২৪৫টি ইয়াবা বড়ি ও ১৩৯ পুরিয়া হেরোইন পাওয়া যায় বলে তিনি জানান।
অধিনায়কের দাবি, চারজনকে আটক করা হলেও তাঁদের মধ্যে তিনজনকে হাতকড়া পরানো হয়েছিল। এরপর আটক ব্যক্তিরা চিৎকার শুরু করলে আশপাশ থেকে বিপুলসংখ্যক লোক জড়ো হয়ে এসআরবি সদস্যদের ওপর হামলা চালান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা প্রথমে গুলি ছোড়ে; এরপর সদস্যদের ঘিরে ধরে মারধর করা হয়, তাঁদের মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং একপর্যায়ে দুই সদস্যের পিস্তল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়। তখন আত্মরক্ষায় চারটি গুলি ছোড়া হয় বলে তিনি জানান। তাঁর দাবি, হামলাকারীদের দিক থেকে ছয় থেকে আটটি গুলির শব্দ পাওয়া গেছে এবং সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে আসার সময়ও গুলির শব্দ শুনেছেন। ঘটনাস্থলে কতটি গুলির খোসা পাওয়া গেছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
তাঁদের সদস্যদের ছোড়া গুলিতে মারুফের মৃত্যু হয়েছে কি না—এ প্রশ্নে এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক বলেন, সদস্যরা আকাশের দিকে গুলি ছুড়েছেন; অন্য পক্ষ থেকেও গুলি চালানো হয়েছে। ফলে কোন গুলিতে মারুফের মৃত্যু হয়েছে, সেটি তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়। এসআরবির মুখপাত্রও একই বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মাদক অপারেশন হয়েছে এবং সেখানে আমাদের সদস্যদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছিল। তাঁরা প্রাণ রক্ষার্থে ওখানে ফাঁকা গুলি করে সেখান থেকে সরে আসেন। এরপর হতাহতের ঘটনা কী আছে, সেটা তদন্তে বের হয়ে আসবে।’
মারুফকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এজাহারের উল্লেখ অনুযায়ী, সেখানে সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের মা সেলিনা বেগম জানিয়েছেন, তাঁর ছেলের গলায় গুলি লেগেছিল। এজাহারে ডান কাঁধে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা গলার দিক থেকে শরীরের নিচের অংশ পর্যন্ত গুলির গতিপথের কথা বলছেন। ফলে গুলি ঠিক কোন দিক থেকে এসেছিল, তা নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত ও ব্যালিস্টিক পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মারুফের বাবা আবদুর রশিদ মারা গেছেন; মা সেলিনা বেগম মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করেন। তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে মারুফ ছিলেন সবার ছোট। তিনি একটি সিলভার বা অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল তৈরির কারখানায় কাজ করতেন; প্রতিদিন বিকেল পাঁচটার দিকে বাসায় ফিরতেন। ছেলের আয় আর মায়ের গৃহকর্মের টাকা দিয়েই সংসার চলত। মঙ্গলবার সকালে স্বাভাবিকভাবে কাজে যান মারুফ, বিকেল পাঁচটার দিকে বাসায় ফিরে পোশাক বদলে কিছুক্ষণ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান, পরে আবার ঘরে আসেন—এরপর স্ত্রীকে রান্নার কথা বলে বেরিয়ে যান।
প্রায় এক বছর চার মাস আগে মারুফ ও মীমের বিয়ে হয়; তাঁদের কোনো সন্তান নেই। মীম বলেন, তাঁর স্বামী কখনোই মাদক সেবন করতেন না, কারও সঙ্গে ঝগড়াবিবাদও ছিল না। স্বামীকে হারিয়ে তাঁর প্রশ্ন, ‘আমার স্বামী হত্যার বিচার কি পাব না?’ মা সেলিনা বেগম বলেন, তাঁর ছোট ছেলের বিরুদ্ধে আগে কোনো মামলা ছিল না; এলাকায় সবাই তাঁকে ভালো ছেলে হিসেবে জানতেন। ছেলের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সোনার টুকরা ছেলেটা মারা গেছে।’
ঘটনার পরপরই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দুর্বৃত্তদের গুলিতে মারুফের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু ওই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলার বিষয়টি সামনে আসার পর তাঁর মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এ ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলামের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অভিযানের সময় কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে; একদিকে আত্মরক্ষার্থে ফাঁকা গুলি ছোড়ার কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে এসআরবির একটি ক্যাম্প থেকে ওই এলাকায় দল পাঠানোর বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে বলে সংগঠনটির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সংগঠনটির ভাষ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় তিনজনকে হাতকড়া পরানোর সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং দুজন এসআরবি সদস্যের গুলি ছোড়ার তথ্য পাওয়া গেছে; এসব অসংগতি দূর করতে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বাইরে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
মামলার এজাহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এজাহারের অনুলিপিতে বাদী হিসেবে সেলিনা বেগমের নাম রয়েছে; সঙ্গে থানায় যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর বড় ছেলে মো. আলী হোসেন হাওলাদারের। এজাহারে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে ১৪ নম্বর আউটফল স্টাফ কোয়ার্টারের পরিত্যক্ত ভবনের সামনে পৌঁছালে গোলাগুলি শুরু হয়; পালানোর সময় মারুফের ডান কাঁধে গুলি লাগে। স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে বাদী জেনেছেন, মাদক ব্যবসায়ী ও দুর্বৃত্তরা এসআরবিকে লক্ষ্য করে গুলি চালান এবং তাঁদের প্রতিহত করতে এসআরবি সদস্যরা আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি ছোড়েন। অর্থাৎ এজাহারের বর্ণনায় মাদক কারবারিদের গুলিতেই মারুফের মৃত্যুর অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে সেলিনা বেগম বলেন, বুধবার দুপুর ১২টার দিকে তিনি থানায় মামলা করতে যান; বিকেল চারটা পর্যন্ত তাঁকে বসিয়ে রাখা হয়। এরপর একটি কাগজে তাঁর টিপসই নেওয়া হয়; সেখানে কী লেখা ছিল, তা তাঁরা জানেন না। পরে মামলা হবে বলে জানানো হয়। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মামলা হয়েছে কি না, তা তাঁকে জানানো হয়নি। অন্যদিকে ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার জানিয়েছেন, ঘটনার পর তিনটি মামলা হয়েছে—একটি হত্যা মামলা, একটি মাদকদ্রব্যসংক্রান্ত এবং অন্যটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায়। তাঁর ভাষ্য, হত্যা মামলাটি আলাদাভাবে তদন্ত করা হচ্ছে; অন্য দুটি মামলার সঙ্গে সেটি এক করে দেখা হচ্ছে না।
মারুফের মৃত্যু ঘিরে প্রশ্নের মধ্যেই ধলপুর সিটি পল্লিতে নতুন করে ধরপাকড় শুরু হয়েছে; এতে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা। বোন রোকসানা আক্তার বলেন, ঘটনার পর থেকে বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় অভিযান চালাচ্ছেন এবং মাদক কারবারের অভিযোগে অনেককে ধরে নেওয়া হচ্ছে; তাঁদের মধ্যে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষও রয়েছেন বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি বলেন, ‘আমার ভাইরে শেষ করে দিল। আবার জুলুমও করতাছে। আবার আমাগো এলাকা ছাড়াও করতাছে। আমরা কই যামু?’
ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর সেখানে বড় ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে, যাতে পুলিশের সঙ্গে এসআরবির সদস্যরাও অংশ নেন; প্রায় ৪০ জনকে আটক করা হয়েছে এবং যাচাই করে কয়েকজনকে হয়তো ছাড়া হবে। তিনি আরও জানান, ধলপুর সিটি পল্লি ঘিরে পুলিশের আগে থেকেই উচ্ছেদের পরিকল্পনা ছিল; এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ জন্য তাঁরা বস্তিটি উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং আগে মাইকিংও করা হয়েছিল। তবে বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের বিষয়টি সামনে আসায় উচ্ছেদ কার্যক্রম এগোয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকার রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সেখানে ১২০টি ঘর নির্মাণের একটি প্রকল্পের কথা জানানো হয়েছিল। এসআরবি সদস্যদের ওপর হামলার পর উচ্ছেদে আরও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের নেক্সট মুভ হলো, আমরা বস্তিটাকে উচ্ছেদ করব।’




