মানবতাবিরোধী অপরাধে হানিফের মৃত্যুদণ্ড, তিন নেতার আমৃত্যু কারাদণ্ড

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই মামলার অপর তিন আসামিকে দেওয়া হয়েছে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বৃহস্পতিবার এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া তিনজন হলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান। হানিফসহ দণ্ডিত চার আসামিই পলাতক।
রায় ঘোষণার জন্য বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৫০ মিনিটের পর ট্রাইব্যুনাল-২–এর বিচারক ও বিচারপতিরা আসন গ্রহণ করেন। দুপুর ১২টার আগেই ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা শুরু করেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, মামলার কোনো আসামি উপস্থিত না থাকায় তাঁরা বিস্তারিত রায় পড়ছেন না; কার কী সাজা হয়েছে, তা ঘোষণা করছেন।
রায়ে বলা হয়েছে, এই মামলার সব আসামির স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করা হলো। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং সব কটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। সব অভিযোগেই আসামিদের বিভিন্ন ধরনের সাজা দেওয়া হয়েছে।
এক নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, মাহবুব উল আলম হানিফের প্ররোচনা, উসকানি, অনুমোদন ও নির্দেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাঁর অধীন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালান। সেদিন গুলিতে ছয়জন শহীদ হন — আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, বাবুল ফরাজী ও ইউসুফ শেখ। এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই অভিযোগে সদর উদ্দিন খান, আসগর আলী ও আতাউর রহমানকে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
দুই নম্বর অভিযোগটি অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ড-সংক্রান্ত। এতে বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় অপরাধমূলক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হানিফ ও তাঁর সহযোগীরা কুষ্টিয়া এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শত শত নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিক ও শিক্ষার্থীর ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে মারাত্মক শারীরিক জখম, নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক ও মর্যাদাহানিকর আচরণ করেছেন। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে গুলি করা, মারধর করা, বেআইনিভাবে আটকে রাখা এবং আহতদের চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা। এগুলো হানিফের জ্ঞাতসারে ও সম্মতিতে সংঘটিত হয়েছিল। এই অপরাধে তাঁকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দুই নম্বর অভিযোগে বাকি তিন আসামিকেও যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তিন নম্বর অভিযোগটি রাজনৈতিক কারণে নিপীড়ন বিষয়ে। এতে বলা হয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় হানিফ ও তাঁর সহযোগীরা আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। এর মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের হত্যা, নির্যাতন ও নির্বিচার গ্রেপ্তারের উসকানি দেন তিনি। এই অপরাধে হানিফসহ চার আসামিকেই যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
চার নম্বর অভিযোগে চার আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র ও সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তাঁরা কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল পদে থেকে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি প্রাণঘাতী উপায়ে দমন করতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রিসভার প্রণীত নীতি বাস্তবায়নে সজ্ঞানে ষড়যন্ত্র ও সহায়তা করেছেন। এই অপরাধে হানিফসহ চার আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পাঁচ নম্বর অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে ‘যৌথ পরিকল্পনা এবং অপরাধমূলক সংগঠনের’ অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে আক্রমণ করা হয়। একটি সাধারণ নিপীড়নমূলক নীতির আওতায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও তাদের সহযোগী ১৪-দলীয় জোট অপরাধমূলক সংগঠন হিসেবে এই অপরাধ করে এবং যৌথভাবে এসব অপরাধের পরিকল্পনা করে। এই মামলার আসামিরা সেই সংগঠনের অংশ হিসেবে অপরাধ করেছেন। এই অভিযোগেও চার আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রায় ঘোষণার পর পাঁচ নম্বর অভিযোগের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম সাংবাদিকদের বলেন, সারা দেশে ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে আক্রমণের মাধ্যমে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে, এটি ছিল আওয়ামী লীগের একটি সাংগঠনিক পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়ন করেছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও ১৪-দলীয় জোট। এটি প্রমাণিত হওয়ায় চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই রায়ে আওয়ামী লীগকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে বলেন, এই রায় তাঁর কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হয়েছে; তিনি হতাশ। আর চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মনে করি, অত্যন্ত সময়োপযোগী রায় হয়েছে। জুলাইয়ের শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছি।’
এ নিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় মোট আটটি মামলার রায় ঘোষণা করা হলো। এসব রায়ে মোট ৭২ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২৩ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ১৯ জন পলাতক এবং ৪ জন কারাগারে আছেন।




