আইস কর্মীদের তথ্য ফাঁস: ওয়েবসাইট বন্ধের মার্কিন চেষ্টা ব্যর্থ, তথ্য ছড়িয়েছে নতুন ঠিকানায়
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) আইসল্যান্ডের একটি ওয়েব হোস্টিং কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে তাদের হাজার হাজার কর্মীর তথ্যসংবলিত একটি ওয়েবসাইট সরিয়ে ফেলতে বলেছিল। তবে কোম্পানিটি সেই অনুরোধ মানেনি। শেষ পর্যন্ত ডোমেইনটি স্থগিত হলেও কর্মীদের তথ্য এখন অন্য একটি ডোমেইনে চলে গেছে।
বৃহস্পতিবার আইসল্যান্ডের কোম্পানি ফ্লোকিনেট ডিএইচএসের পক্ষ থেকে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান জিরোফক্সের পাঠানো একটি চিঠি প্রকাশ করেছে। চিঠিতে ফ্লোকিনেটের বিরুদ্ধে ‘চুরি করা’ কর্মী তথ্যভান্ডার প্রকাশ করে সেবার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয় এবং তথ্যগুলো ‘সরিয়ে ফেলতে বা নিষ্ক্রিয় করতে’ বলা হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘এই কনটেন্ট অনলাইনে আছে এবং ৪০ হাজারের বেশি শনাক্তযোগ্য ব্যক্তিকে হয়রানি, পিছু নেওয়া ও শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকিতে ফেলছে।’ অর্থাৎ মার্কিন কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ফাঁস হওয়া তথ্যে ৪০ হাজারের বেশি কর্মীর পরিচয় রয়েছে।
ফ্লোকিনেট জানিয়েছে, চিঠিটি icepi.cx নামের একটি ডোমেইন নিয়ে। এই সাইটে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) ও কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি)সহ ডিএইচএসের বিভিন্ন সংস্থার কর্মীদের তথ্য সংকলন করা হয়েছিল।
২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গণবহিষ্কার অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে এই সংস্থাগুলো তীব্র নজরদারির মুখে আছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলে নির্দিষ্ট অভিযানে জড়িত ডিএইচএস এজেন্টদের পরিচয় প্রকাশ করতে প্রায়ই অস্বীকার করে এসেছে।
ফ্লোকিনেট জানিয়েছে, তারা ডিএইচএসের অনুরোধ মানতে অস্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত ওয়েবসাইটটির রেজিস্ট্রার ডোমেইনটি স্থগিত করে দেয়। এরপর কর্মীদের তথ্য অন্য একটি ডোমেইনে স্থানান্তরিত হয়েছে। অনলাইনে দেওয়া এক বিবৃতিতে সাইটটি না সরানোর সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে ফ্লোকিনেট।
কোম্পানিটি বলেছে, ‘একটি আইন প্রয়োগ কর্মসূচি পরিচালনাকারী ফেডারেল কর্মকর্তারা সেই কাজ করার সময় ব্যক্তিগত নাগরিক নন। জনগণের এটা জানার বৈধ স্বার্থ আছে যে, কে সেই কাজ করছে, কার কর্তৃত্বে করছে এবং কোন অফিসে করছে।’ কোম্পানিটি তথ্য প্রকাশকে ‘বৈধ’ জনস্বার্থ পূরণকারী বলে দাবি করেছে।
তথ্যভান্ডারটি প্রথম বুধবার অনলাইনে পোস্ট করে ডিস্ট্রিবিউটেড ডিনায়াল অব সিক্রেটস (ডিডিওসিক্রেটস) নামের একটি গোষ্ঠী, যারা ফাঁস হওয়া সরকারি তথ্য প্রকাশ করে থাকে। অতীতে এই গোষ্ঠী দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের ইমেইল, ইসরায়েলের বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ বিভাগগুলোর তথ্য প্রকাশ করেছে।
‘ডিপার্টমেন্ট অব পিস’ নামের একটি হ্যাকার গোষ্ঠী ডিএইচএসের এই তথ্য সংগ্রহ ও ভাগ করে নেওয়ার দায় স্বীকার করেছে। তথ্যভান্ডারটি প্রথম প্রকাশের পর থেকে অন্যান্য গোষ্ঠীও icepi.cx-এর মতো সাইটে তথ্য ছড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এই তথ্য ইন্টারনেট থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে আইস কর্মী ও অভিবাসন অভিযানে জড়িত অন্য এজেন্টদের তথ্য আছে বলে দাবি করা অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত বছর মার্কিন বিচার বিভাগ অ্যাপলের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের আইস এজেন্টদের গতিবিধি অনুসরণকারী অ্যাপ সরিয়ে ফেলতে চাপ দিয়েছিল; এর মধ্যে আইসব্লক নামের একটি অ্যাপও ছিল।
ওই পদক্ষেপে ডেমোক্র্যাট ও বাকস্বাধীনতা কর্মীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। তাঁদের যুক্তি ছিল, আইসের গতিবিধি সম্পর্কে প্রতিবেদন করার অধিকার জনগণের আছে। ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেমি রাসকিন গত বছর অ্যাপলকে সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনা করতে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘ফেডারেল সরকারের অনুরোধে এসব অ্যাপে প্রবেশ বন্ধ করা হলে স্বতন্ত্র সম্ভাবনা তৈরি হয় যে, অ্যাপল সরকারের সঙ্গে মিলে গ্রাহকদের সরকারের কার্যক্রম রেকর্ড করা ও সে বিষয়ে প্রতিবেদন করার প্রথম সংশোধনীর অধিকার লঙ্ঘন করছে।’
এদিকে অভিযান চলাকালে অভিবাসন এজেন্টরা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন, যার মধ্যে মুখে মাস্ক পরা বা সাধারণ পোশাক পরা রয়েছে। এই স্বচ্ছতার অভাব মানবাধিকার গোষ্ঠী ও অভিবাসন অধিকারকর্মীদের সমালোচনার মুখে পড়েছে। তাঁদের যুক্তি, আইসের অভিযানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা অনিয়মের অভিযোগের প্রতিকার চাওয়ার পথ তাঁদের কাছে খুব কম।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ নেওয়ার পর থেকে অভিবাসন এজেন্টদের গুলির মুখে পড়েছেন অন্তত ২৫ জন। এর মধ্যে ছয়টি গুলির ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে। অন্যান্য ঘটনায় বেআইনি গ্রেপ্তার ও জাতিগত প্রোফাইলিংসহ নাগরিক স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে; গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দেওয়া ও ধরে ফেলে দেওয়ার মতো বিতর্কিত কৌশলের অভিযোগও রয়েছে।



