এল নিনো খরায় পাপুয়া নিউ গিনিতে ‘জাতীয় সংকট’, নদী শুকিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৮০ লাখ মানুষ

ঐতিহাসিক এল নিনোর কারণে সৃষ্ট চরম খরায় পাপুয়া নিউ গিনিতে (পিএনজি) ৮০ লাখ পর্যন্ত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাদ্য ও পানির ঘাটতি থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সংকট ও স্কুল ব্যাহত হওয়া পর্যন্ত নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে।
গির্জা, ট্রেড ইউনিয়ন ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীসহ একটি প্রভাবশালী জোট বলেছে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশটি একটি ‘জাতীয় সংকটের’ মধ্যে রয়েছে। তবে এল নিনোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়গুলোকে রক্ষায় কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয় না, তারা বলেছে।
বাসিন্দা ও স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন, নদী ও খাঁড়ি শুকিয়ে গেছে এবং পরিবারের খাদ্য বাগান — অনেকের জন্য খাদ্য ও আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস — শুকিয়ে গেছে। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র আগেভাগে বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে।
পিএনজিতে কেয়ার ইন্টারন্যাশনালের মানবিক প্রকল্প ব্যবস্থাপক এমিলি মেরেন বলেন, গ্রামীণ উচ্চভূমি এলাকায় পরিবারগুলো দিনে এক বেলা খাবারে রেশন করছে। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা পরিবারগুলোর মধ্যে স্থানীয় বিরোধেরও কারণ হচ্ছে।
তিনি বলেন, নারী ও মেয়েদের পরিবারকে সহায়তায় আরও বেশি কাজ করতে হচ্ছে, অথচ তারা সবার শেষে খায়, কারণ তাদের আগে অন্যদের পরিবেশন করতে হয়। পানি ও খাবারের জন্য তাদের তিন থেকে চার ঘণ্টা পথ পাড়ি দিতে হয় এবং হয়রানির ঝুঁকি বেড়ে যায়। সম্প্রদায়ে অর্থ বা খাবারের বিনিময়ে যৌন সম্পর্কের ঘটনার কথাও শোনা যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো জোরদার হচ্ছে। পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, এটি হবে এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নে এর প্রভাব আরও খারাপ হচ্ছে।
পিএনজির কিছু অংশে আগস্ট থেকে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের এক-চতুর্থাংশেরও কম হয়েছে।
পিএনজি জাতীয় আবহাওয়া পরিষেবা জুনে এল নিনো শুরুর ঘোষণা দেয়। পরিষেবাটির সহকারী পরিচালক কাসিস ইনাপে বলেন, সেই সময়েই দেশের বড় অংশ খরায় ছিল এবং প্রায় ৮০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
ইনাপে বলেন, পিএনজি পৃথিবীর সবচেয়ে আর্দ্র স্থানগুলোর একটি, যেখানে উষ্ণ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পানি থেকে বৃষ্টি আসে। কিন্তু এল নিনোতে সেই পানি পূর্ব দিকে সরে গেছে এবং তারা বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি বলেন, বৃষ্টিনির্ভর দেশ হওয়ায় অনেক মানুষ জীবিকা নির্বাহী কৃষক এবং বেঁচে থাকা ও খাবারের জন্য তারা শুধু বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে।
পিএনজির বর্ষা মৌসুম নভেম্বর থেকে এপ্রিল। ইনাপে বলেন, কিছু স্বল্পমেয়াদি স্বস্তির পূর্বাভাস থাকলেও এল নিনো মৌসুমটি সংক্ষিপ্ত করে দিতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। তিনি বলেন, জায়গাটি এত শুষ্ক যে মাত্র দুই মাসের বৃষ্টি ফসল জন্মানো ও পানির স্তর স্বস্তিদায়ক করার জন্য যথেষ্ট নয়।
মোরোবে প্রদেশের বুলোলো জেলায় ছোট নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় পরিবারগুলো পান করা, রান্না ও ধোয়ার পানি পাচ্ছে না। বাসিন্দা থিওফিল জারাক বলেন, অনেক স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র অর্ধেক দিনই চলছে এবং পানির অভাবে কিছু ক্লিনিক আর ভর্তি রোগী নিচ্ছে না।
লেকলু গ্রামের বাসিন্দা মার্থা জুরেনো বলেন, তাদের বাড়ির পেছনের নদীসহ সব নদী শুকিয়ে গেছে। এখন তাকে ও তার সন্তানদের প্রতিদিন বিকেলে মাইলের পর মাইল হেঁটে অন্য দিক থেকে রান্না ও পান করার পানি আনতে হয়। নিজেদের খোঁড়া কূপের পানি তারা শুধু ধোয়ার কাজে ব্যবহার করেন। বাগানের সব ফসল শুকিয়ে মরে গেছে এবং এখন কিছুই জন্মানো যাচ্ছে না।
জুরেনো বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকাংশই আয়ের জন্য সোনা ছাঁকনির ওপর নির্ভর করে, কিন্তু পানি না থাকায় তাও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে।
এদিকে এ মাসের শুরুতে এঙ্গা প্রদেশের কিছু অংশে ধ্বংসাত্মক শিলাবৃষ্টি — যা সরাসরি এল নিনোর জন্য দায়ী করা হয়নি — মিষ্টি আলু বরফের নিচে চাপা দিয়েছে, ফলে খাদ্য সংকট আরও বেড়েছে বলে সাম্বে ইউনিটি ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জর্জ ইকি জানিয়েছেন।
রাজধানী পোর্ট মোর্সবিতে পিএনজি পাওয়ার বাঁধের পানি কমে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিকল্পিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু করেছে এবং বলেছে, বিঘ্ন ১০ মাস পর্যন্ত চলতে পারে। শহরের পানি সরবরাহ রক্ষায় কোম্পানিটি বাঁধের পানি ছাড়ার ব্যবস্থাপনা করছে।
প্রখ্যাত পিএনজি ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি কোয়ালিশন অ্যাগেইনস্ট করাপশনের সহ-সভাপতি পিটার আইতসি বলেন, সরকারকে বিশেষ করে গ্রামীণ সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাবের সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে। গত মাসে গোষ্ঠীটি খরা পরিস্থিতিকে ‘জাতীয় সংকট’ বলেছিল। আইতসির মতে, নগর কেন্দ্রগুলো এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ প্রভাব থেকে রক্ষা পেলেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও খরা-কবলিত এলাকা থেকে তাজা খাবারের ঘাটতিতে তা বদলে যেতে পারে।
তিনি বলেন, গত সপ্তাহে রাজধানী ধোঁয়ার কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছিল; দ্বীপের অন্যত্র ও পশ্চিমে ইন্দোনেশিয়ায় আগুন থেকে এই ধোঁয়া এসেছে, যা বিজ্ঞানীদের মতে এল নিনোতে আরও বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জেমস মারাপে প্রাদেশিক ও জেলা কর্তৃপক্ষকে দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমের জন্য প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, তার সরকার দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়তার জন্য আর্থিক ব্যবস্থা খতিয়ে দেখছে। মারাপে বলেন, মন্ত্রিসভা আর্থিক নির্দেশনার বিধান এমনভাবে সাজানোর কথা ভাবছে, যাতে দুর্যোগ ঘটলে জেলা ও প্রদেশগুলো যথাযথভাবে সাড়া দিতে সহায়তা পায়।




