ইসরায়েলের চূড়ান্ত ফলে আরব দলগুলোর রেকর্ড ১৯ আসন, ৬১ আসন পায়নি কোনো জোটই

ইসরায়েলের ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়েছে আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো। জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন অর্জন করেছে, যা দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসে আরব দলগুলোর সর্বোচ্চ আসনসংখ্যা। আগের নেসেটে দল দুটির সম্মিলিত আসন ছিল ১০টি; এবার তাদের আসন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই ফল সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দলগুলোর গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
শুক্রবার ভোরে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি (সিইসি) ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে। ফল অনুযায়ী, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন, নেতানিয়াহুবিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন এবং আরব দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো পক্ষই অর্জন করতে পারেনি।
আরব দলগুলোর এই সাফল্য সত্ত্বেও নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের জন্য তাদের সমর্থন কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, দ্য ডেমোক্র্যাটস ছাড়া জায়নবাদী জোটের অন্য সব সদস্য দল রা’আম কিংবা জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে। ফলে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন নেতানিয়াহুবিরোধী জোটকে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেওয়ার মতো অবস্থানে থাকলেও রাজনৈতিক সমীকরণে তা কাজে লাগানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
দলভিত্তিক ফলে লিকুদ পার্টি ২৭টি আসন পেয়ে সবচেয়ে বেশি আসন অর্জন করেছে। ইয়াশার পেয়েছে ২১টি, বি’ইয়াচাদ ১২টি, জয়েন্ট লিস্ট ১১টি, দ্য ডেমোক্র্যাটস ৮টি, রা’আম ৮টি, ইসরায়েল বেইতেনু ৭টি, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ৭টি, ওৎজমা ইহুদিত ৭টি, শাস ৬টি এবং রিলিজিয়াস জায়নবাদ ৬টি আসন।
অন্যদিকে ইয়োয়াজ হেন্ডেলের রিজার্ভিস্টস-ইকোনমিক পার্টি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশের নির্বাচনী সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। ওফের উইন্টারের পিপল অব ইসরায়েল পার্টি পেয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। অতি-গোঁড়া ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য বিকল্প রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দেওয়া দ্য হারেদি পাবলিক পার্টি পেয়েছে মাত্র ০ দশমিক ২ শতাংশ ভোট।
নির্বাচনে মোট ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। মোট ৫৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৫ জন ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
এদিকে নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি। শুক্রবার ভোরে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কমিটি ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডিন লিভনের আগের দিনের বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করে। ভোটের ফলাফল প্রভাবিত করতে কাতারের সম্ভাব্য প্রচারাভিযান নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর কারচুপির অভিযোগ সামনে আসে। বৃহস্পতিবার ডিন লিভনে বলেন, ‘সারাদিন ধরে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।’ তিনি জানান, অভিযোগের বিষয়ে চলমান তদন্ত প্রেসিডেন্টের কাছে জমা দেওয়া চূড়ান্ত ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলবে না এবং তদন্তটি জনসংখ্যার কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে না।
চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলাফলের পূর্ণাঙ্গ সরকারি প্রতিবেদন আগামী বুধবার প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। এর আগে ভোটের ফলাফলে কোনো ভুলত্রুটি বা অভিযোগ থাকলে সেগুলো নিয়ে শেষ দফার তদন্ত সম্পন্ন করবে নির্বাচন কমিটি। এরপর পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সুপারিশ শুনবেন প্রেসিডেন্ট; এ লক্ষ্যে প্রতিটি দলের নেতার সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন তিনি।
নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, কারণ কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কাছাকাছি অবস্থানে নেই। তবে আগামী ১০ নভেম্বর নতুন নেসেটের সদস্যদের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। বুধবার প্রেসিডেন্ট হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের আরেক দফা নির্বাচন এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আরেক দফা নির্বাচন এড়াতে আমাদের সম্ভাব্য সবকিছু করতে হবে। তাই এখানে যারা আসবেন, তাদের প্রত্যেকের কাছেই আমি খোলা মন নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার প্রত্যাশা করছি।’
পরবর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং গাদি আইজেনকোট—দুজনই নিজেদের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন; দুজনেরই দাবি, পরবর্তী সরকার তারাই গঠন করবেন। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন হয়েছিল চার বছর পর। এর আগে টানা তিন বছর ধরে ইসরায়েলে পাঁচবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যার মধ্যে প্রথম চারটিই স্থিতিশীল সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়। নতুন ফলাফলে আরব দলগুলোর আসনসংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছালেও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে সহযোগিতার প্রশ্নটি এখন ইসরায়েলের রাজনৈতিক সমীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।




