…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › জাতীয় › খবর
জাতীয়

আরিচা-টাঙ্গাইল সড়ক প্রকল্পে ‘হস্ত রশিদে’ ১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার বিল, স্যালভেজের কোটি টাকা না কেটেই ছাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক
আরিচা-টাঙ্গাইল সড়ক প্রকল্পে ‘হস্ত রশিদে’ ১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার বিল, স্যালভেজের কোটি টাকা না কেটেই ছাড়
ছবি: সংগৃহীত

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৩টি জেলার সঙ্গে ঢাকা, ময়মনসিংহ বিভাগ ও উত্তরাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগের বিকল্প পথ হিসেবে ২০২২ সালে আরিচা (বরঙ্গাইল)-ঘিওর-দৌলতপুর-নাগরপুর-টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়ক (আর-৫০৬) নির্মাণ শুরু হয়। প্রায় ৫৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১০ দশমিক ৩০ মিটার চওড়া, চার লেনের উপযোগী এই মহাসড়ক ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-টাঙ্গাইল জাতীয় মহাসড়কের যানজট এড়ানোর কৌশলগত বাইপাস হিসেবে নেওয়া হয়।

মানিকগঞ্জের শিবালয়, ঘিওর, দৌলতপুর এবং টাঙ্গাইলের নাগরপুর, দেলদুয়ার ও টাঙ্গাইল সদর — এই ছয় উপজেলার কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি ১০ লাখ টাকার প্রকল্পটি হাতে নেয় সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর। অনুসন্ধানে এখন এই প্রকল্পে সরকারি অর্থ নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে।

নথিপত্র অনুযায়ী, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী কাজের সরেজমিন পরিমাপ ও কার্য-সম্পাদন সনদ ছাড়া বিল পাসের সুযোগ নেই। কিন্তু এই প্রকল্পে কোনো পরিমাপ বা সনদ ছাড়াই ম্যানুয়াল ‘হস্ত রশিদের’ মাধ্যমে ছয়জন ঠিকাদারকে ১৩ কোটি ৭৫ লাখ ৬৫ হাজার ৪৫৮ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সকে (এনডিই) ২০২৩ সালের ২২ জুন একটিমাত্র হস্ত রশিদে, ভাউচার নম্বর ২৪৮-এ, এককভাবে ১০ কোটি ৫৬ লাখ ২ হাজার ২০০ টাকা পরিশোধ করা হয়। বাজেটের টাকা ফেরত যাওয়া ঠেকাতে এই বিল পাসের অজুহাত দেখানো হলেও আইএমইডি ও অডিট দল একে গুরুতর আর্থিক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ঢালাই সড়ক নির্মাণে অনুমোদিত নকশার অতিরিক্ত এমএস বার বা রড প্রাক্কলনে অন্তর্ভুক্ত করে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। আইএমইডির পরিদর্শন অনুযায়ী, সরেজমিনে কাজ যাচাই ছাড়া প্রাক্কলনে অতিরিক্ত রড দেখিয়ে ঠিকাদারকে ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৮৮৮ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে।

নির্মাণকালে সড়ক চালু রাখতে সাময়িক রক্ষণাবেক্ষণে নির্দিষ্ট ইটের হিসাব ডিঙিয়ে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫১২ টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়, যার কোনো মেজারমেন্ট বুক নেই। সড়কের ডিবিএস বেস কোর্সে স্পেসিফিকেশন-বহির্ভূত অতিরিক্ত পুরুত্ব প্রাক্কলনে দেখিয়ে আরও ৮ লাখ ৬২ হাজার ৪৪১ টাকা অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়।

পুরাতন রাস্তা খননের পর উঠে আসা পাথর, খোয়া ও বিটুমিনাস মালামাল বা স্যালভেজ সামগ্রী ঠিকাদার নিজের কাজে ব্যবহার করলে তার মূল্য বিল থেকে কাটা বাধ্যতামূলক। কিন্তু টাঙ্গাইল অংশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসান টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেডের আইপিসি-২ বিল থেকে স্যালভেজ মালামালের নির্ধারিত ৪৪ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪০ টাকা না কেটেই অর্থ ছাড় করা হয়। একইভাবে এনডিই ও ডিএনকো লিমিটেডের রানিং বিল থেকে স্যালভেজ মালামালের মূল্য ২৯ লাখ ৮৫ হাজার ৮২২ টাকা যথাসময়ে না কেটে পরিশোধ করা হয়।

চুক্তির বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডিএনকো লিমিটেড প্রকল্পের কাজের কোনো নিরাপত্তা বিমা করেনি। কর্মকর্তারা এটি গোপন রেখে নিয়মিত বিল দিয়ে যান। অডিট আপত্তির পর পরবর্তীতে ৯ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ টাকা কর্তন করা হয়।

ভূমি অধিগ্রহণের পর মহাসড়কের জায়গার কাটা গাছপালা ও ভেঙে ফেলা সরকারি স্থাপনার নিলামের নির্ধারিত ১০ শতাংশ অর্থ, অর্থাৎ ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৯৭ হাজার ৮৭৭ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়নি। স্যালভেজ মালামালের মূল্যের ওপর সরকারের প্রাপ্য ৭ লাখ ৯ হাজার ৯২৭ টাকা ভ্যাট ও আয়কর ঠিকাদারদের চলমান বিল, প্যাকেজ WP-3 ও WP-4, থেকে কর্তন করা হয়নি। ভূমি অধিগ্রহণ মামলার অর্থ ব্যয়ে সড়ক বিভাগের আইনি এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত ২ শতাংশ আনুষঙ্গিক খরচের নামে সরকারি কোষাগার থেকে ৫ কোটি ৬৪ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭৯ টাকা ছাড় করা হয়।

এনডিইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রায়হান মোস্তাফিজ বলেন, সড়ক বিভাগ থেকে ম্যানুয়ালি বিল নেওয়ার কোনো পদ্ধতি নেই। প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারি নিয়মকানুন অনুসরণ করেই বিল নেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যত্যয় ঘটে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলতে পারবেন। ডিএনকো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এস এম খোরশেদ আলম বলেন, বিমা পলিসির একটি বিষয় নিয়ে কথাবার্তা হয়েছিল, তবে সড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে কেউ অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের জানায়নি। হাসান টেকনো বিল্ডার্সের টাঙ্গাইল প্রজেক্ট ম্যানেজার মাসুদ সরকার বলেন, স্যালভেজের নির্ধারিত দর প্রথম বিলেই সড়ক বিভাগ কেটে নেয়, ফলে এমন অনিয়মের সুযোগ নেই। মোজাহার এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মোজাহারুল হকের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

মানিকগঞ্জ সড়ক বিভাগের দায়িত্ব পালনকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহরিয়ার আলম, যিনি টাঙ্গাইলে বদলি হয়েছেন, বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিল প্রদান করা হয়েছে, কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই। আইএমইডি আপত্তি তুলেছে জানানো হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে জবাব দেওয়া হবে। পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশ্নে তিনি বলেন, পরিকল্পনা কমিশন অনুমোদনের সময় যাচাই করেই অনুমোদন দিয়েছে। টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা সড়ক বিভাগে যোগ দেওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী ড. সিনথিয়া আজমিরী খান বলেন, তিনি থাকাকালীন কোনো অনিয়ম হয়নি, আইএমইডি থেকে যাঁরা মূল্যায়ন করেছেন তাঁরা বিশেষজ্ঞ নন এবং তাঁদের নিয়মিত অডিট হয়।

প্রকল্পের শুরুতে ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সবুজ উদ্দিন খান। তিনি বলেন, খাতা-কলমে তিনি প্রকল্প পরিচালক ছিলেন, বিল প্রদানের পুরো বিষয়টি মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইল সড়ক বিভাগ করেছে। এরপর ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ আসলাম আলী। তারপর থেকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে আছেন এ কে এম আজাদ রহমান। তাঁকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি, ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও জবাব দেননি।

জাতীয় সংসদের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য, পিরোজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমীন দুলাল বলেন, এসব অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। আগামী স্থায়ী কমিটির সভায় বিষয়টি তুলে ধরবেন। কোনো অসঙ্গতি থাকলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইএমইডির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সেক্টর-২-এর উপপরিচালক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এই প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পে নানা অসঙ্গতির বিষয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে, এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিল পরিশোধ, কাজের যথাযথ পরিমাপ ও যাচাই ছাড়া অর্থ ছাড় এবং সরকারি সম্পদের মূল্য আদায় না করার মতো অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’ সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান সব প্রশ্ন লিখে দেওয়ার অনুরোধ করেন, পরে সব প্রশ্ন লিখে দেওয়ার পর একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

জাতীয় বিভাগের আরও খবর

গফরগাঁওয়ে চলন্ত মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের বগি বিচ্ছিন্ন, ইঞ্জিন এগিয়ে গেল দুই কিলোমিটার
জাতীয়

গফরগাঁওয়ে চলন্ত মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের বগি বিচ্ছিন্ন, ইঞ্জিন এগিয়ে গেল দুই কিলোমিটার

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে চলন্ত অবস্থায় মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনের বগি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বগি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর রেলের ইঞ্জিন কয়েকটি বগি নিয…

জাতীয়

তাহসিফের মৃত্যু: জিজ্ঞাসাবাদে বন্ধু দীপের কথায় একের পর এক অসংগতি, যাচাই ছাড়া কিছুই মানছে না পিবিআই

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্যে একাধি…

মিরপুর-১-এ দখলমুক্ত ফুটপাতে স্বস্তি পথচারীদের, অটোরিকশার জট আর বাজার হারানোর অসন্তোষ পাশাপাশি
জাতীয়

মিরপুর-১-এ দখলমুক্ত ফুটপাতে স্বস্তি পথচারীদের, অটোরিকশার জট আর বাজার হারানোর অসন্তোষ পাশাপাশি

ঢাকার মিরপুর-১ নম্বর এলাকার সড়ক ও ফুটপাত থেকে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করায় স্বস্তি ফিরেছে পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। আগে যেখানে হাঁটাচলাই কঠি…

জাতীয়

জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও বিকল্প অর্থায়নে সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকার গুরুত্বারোপ

বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং বিকল্প অর্থায়নে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে দুই দেশের অর্থমন্ত্রী পর্যায়ের…