কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় খুঁজে পাওয়া ত্রুটির চাপে বিশ্বের ডিজিটাল অবকাঠামো, ‘পিএইচপি২শেল’ ঘিরে সতর্কতা
বিশ্বের বেশিরভাগ ওয়েবসাইটের পেছনে থাকা স্বেচ্ছাসেবী-চালিত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সক্ষমতা কাজে লাগানো সাইবার হামলার হুমকির মুখে পড়েছে। পিএইচপি বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট চালায়।
এই মাসের শুরুতে বিশ্বজুড়ে কর্তৃপক্ষগুলো ওয়েবসাইট প্রশাসকদের জরুরি আপডেট করার আহ্বান জানায়, কারণ একটি অলাভজনক প্রোগ্রামিং ফাউন্ডেশন গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত করে, যা দিয়ে হ্যাকাররা সিস্টেমে ঢুকে পড়তে পারে। ‘পিএইচপি২শেল’ নামের এই ত্রুটিগুলো স্বতন্ত্র সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এআই ব্যবহার করে আবিষ্কার করেন এবং প্যাচ করার জন্য সরকারি ও করপোরেট ওয়েবসাইটগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
ত্রুটিগুলো পিএইচপির কোডে এক দশকের বেশি সময় ধরে ছিল। তবে উন্নত এআই ছাড়া মানুষের পক্ষে এগুলো কাজে লাগানো খুব জটিল হতো বলে এতদিন তা নজরে আসেনি।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণকারীরা বলছেন, পিএইচপি২শেল হতে পারে এআই-এ উন্মোচিত নিরাপত্তা ত্রুটির ধারাবাহিকতার প্রথমটি। তাঁদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর বড় অংশ স্বেচ্ছাসেবীরা সামলান, যাঁদের কাছে নতুন হুমকি মোকাবিলার সম্পদ ও সময় প্রায়ই থাকে না।
এমআইটির ফিউচারটেকের গবেষণা বিজ্ঞানী পিটার স্ল্যাটারি বলেন, এআই নিরাপত্তা সম্প্রদায়ের অনেকেই বলছিলেন, এটিই হবে সেই ক্ষেত্রগুলোর একটি, যেখানে এআইয়ের ক্ষতিকর প্রভাব প্রথম দেখা যাবে। তিনি সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা কীভাবে এই নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াচ্ছেন তা নিয়ে গবেষণা করেন এবং এআই-সংক্রান্ত বাস্তব ঘটনার হিসাব রাখেন।
পিএইচপির যাত্রা শুরু ১৯৯৫ সালে, যখন ড্যানিশ-কানাডিয়ান প্রোগ্রামার রাসমাস লেরডর্ফ তাঁর অনলাইন জীবনবৃত্তান্ত কতজন দেখছেন তা জানতে চেয়েছিলেন। পরে বিশ্বজুড়ে অন্যরা সফটওয়্যারটি উন্নত করেন। ফেসবুক ও উইকিপিডিয়ার মতো ওয়েবসাইট পিএইচপি দিয়ে তৈরি হয়েছিল। ২০২১ সালে উন্নয়ন সমন্বয়ের জন্য অলাভজনক পিএইচপি ফাউন্ডেশন চালু হয়, যা স্বল্প বাজেটে চলে।
শুধু পিএইচপি নয়, ভোক্তাদের ব্যবহৃত ডিজিটাল অবকাঠামোর বেশিরভাগই ওপেন সোর্স সফটওয়্যারে চলে — মোজিলা ফায়ারফক্স ব্রাউজার, পার্ল, পাইথন ও জাভাস্ক্রিপ্ট ভাষা এবং অ্যাপাচি এইচটিটিপি সার্ভার, যা অ্যাপাচি সফটওয়্যার ফাউন্ডেশন রক্ষণাবেক্ষণ করে। ওপেন সোর্স সমর্থনকারী অলাভজনক সংস্থা ওপেনইউকের প্রধান নির্বাহী আমান্ডা ব্রক বলেন, ‘আজকের বিশ্ব, মালিকানাধীন সফটওয়্যার বিক্রেতাসহ, তার ডিজিটাল অবকাঠামোর জন্য ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল।’
মেটা, গুগল, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় করপোরেশনগুলো সেই স্বেচ্ছাসেবী-নির্মিত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। এখন সেই কোম্পানিগুলোর নিজস্ব এআই সরঞ্জামই এমন গতিতে ত্রুটি খুঁজে বের করছে, যা সামলাতে পিএইচপি ফাউন্ডেশনের মতো দলগুলোর আরও অনেক বেশি সম্পদ দরকার। ব্রক বলেন, বিদ্যমান সম্পদে সব পরিচিত ত্রুটি সারানো সম্ভব নয় এবং ছোট ফাউন্ডেশনগুলোর কাছে শত শত কোটি ডলারের তহবিল নেই।
অন্য সফটওয়্যারের নির্মাতারাও এআই দিয়ে প্রতিরক্ষা যাচাই করার কারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি ত্রুটি খুঁজে পাচ্ছেন। গুগল জানিয়েছে, ক্রোম ব্রাউজারের সর্বশেষ আপডেটে তারা ১,০০০-এর বেশি নিরাপত্তা ত্রুটি খুঁজে পেয়েছে, যা আগের দুই ডজনের বেশি আপডেট মিলিয়ে পাওয়া সংখ্যার চেয়ে বেশি। ফায়ারফক্সের পেছনের মোজিলা ফাউন্ডেশন এপ্রিলে ৪০০-র বেশি ত্রুটি পায়, যা মাত্র এক মাস আগে পাওয়া পূর্ববর্তী রেকর্ড ৭৬টির তুলনায় বড় লাফ।
অ্যাপাচি সফটওয়্যার ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবী নিরাপত্তা দলের সদস্য জারেক পোতিউক বলেন, ‘আমাদের স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি সমস্যা আসছে, কারণ আমরা এআই ব্যবহার করে সেগুলো খুঁজছি।’ তাঁর ভাষ্যে, এআই মডেল দিয়ে স্ক্যান চালানো এখন শিল্পজুড়ে একটি আন্দোলন, তবে স্ক্যানে অর্থ খরচ হয় এবং পরে মানুষকে ভুল ফলাফল বাদ দিতে সেগুলো যাচাই করতে হয়।
এই বছরের শুরুতে অ্যানথ্রপিক ‘প্রজেক্ট গ্লাসউইং’ চালু করে, যেখানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যারে ত্রুটি খুঁজতে তার উন্নত ক্লড মিথোস এআই মডেলের জন্য ১০ কোটি ডলারের ক্রেডিট দেওয়া হয়। এক মাসে ১,০০০-র বেশি ওপেন সোর্স প্রকল্পে ২৩,০০০-র বেশি ত্রুটি পাওয়া যায়। অ্যাপাচি ফাউন্ডেশন ‘আলফা-ওমেগা’ প্রকল্পের সুবিধা নিচ্ছে, যা অ্যানথ্রপিক, অ্যামাজন, গুগল, মাইক্রোসফট ও ওপেনএআইয়ের সমর্থনে বছরে প্রায় ৭০ লাখ ডলার খরচ করে এবং ফাউন্ডেশনের রক্ষণাবেক্ষণে থাকা ২৯০টি সফটওয়্যার প্যাকেজ স্ক্যান করছে।
পোতিউক বলেন, ত্রুটি খুঁজে সারানোর কাজ প্রায়ই গুটি কয়েক স্বেচ্ছাসেবীর ওপর এসে পড়ে, আর করপোরেট বিশ্ব আরও বেশি করতে পারে। তাঁর প্রস্তাব, গুগল বা মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রতিষ্ঠান পিএইচপির মতো প্রকল্প কিনে নেওয়ার বদলে কর্মীদের কাজের সময়ের কিছু অংশ তারা যে ওপেন সোর্স প্রকল্প ব্যবহার করে, তা রক্ষণাবেক্ষণে দিতে পারে। ২০২১ সালের ‘লগ৪শেল’ ত্রুটি, যা অ্যাপাচির রক্ষণাবেক্ষণে থাকা একটি লাইব্রেরি দিয়ে লাখো ডিভাইসে দূর থেকে কোড চালানোর সুযোগ দিয়েছিল, ওপেন সোর্সের গুরুত্ব দেখিয়ে দিয়েছিল — সেই ত্রুটি এআই ছাড়াই আবিষ্কৃত হয়েছিল।
স্ল্যাটারি বলেন, তাঁদের হিসাব রাখা ঘটনার ডেটাবেসে দেখা যাচ্ছে, শনাক্ত হওয়া ত্রুটির সংখ্যা বাড়ছে এবং কোনো কোনোটি বাস্তবে কাজে লাগানো এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিনি বলেন, ‘আমরা একদিকে অনেক বেশি ত্রুটি সময়মতো শনাক্ত ও মোকাবিলা হতে দেখছি, অন্যদিকে বিস্তৃত পরিসরে সিস্টেমের ওপর হামলাও দেখছি।’




