সৌদি আরবে হুতিদের হামলায় রুশ স্যাটেলাইটের সহায়তার প্রমাণ মিলেছে তদন্তে

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সৌদি আরবের সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলায় রাশিয়ার সামরিক স্যাটেলাইট সহায়তা করছে বলে এক তদন্তে উঠে এসেছে। জেনেভাভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অরোরা জিওসিগন্যাল ইন্টেলিজেন্সের এই অনুসন্ধান এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে হুতিদের লড়াই চলছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এমনিতেই অস্থির।
সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, অরোরা গত ১ জুলাই থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বিশ্লেষণ করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, হামলার আগে ও পরে লক্ষ্যবস্তু এলাকাগুলো রাশিয়ার সরকারি ও সামরিক স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ করেছে।
অরোরার প্রতিষ্ঠাতা নওয়াফ ওবায়েদ আল জাজিরাকে বলেন, রাশিয়ার সামরিক নজরদারি কাঠামো পুনর্গঠন করে তাঁরা পৃথক পৃথক স্যাটেলাইট শনাক্ত করেছেন, সেগুলোর কক্ষপথের গতিপথ হিসাব করেছেন এবং সৌদি আরব, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেনজুড়ে সামরিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে স্যাটেলাইটগুলোর তৎপরতার মিল খুঁজে পেয়েছেন।
তদন্তে শনাক্ত স্যাটেলাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার বারস-এম সামরিক মানচিত্র স্যাটেলাইট, পারসোনা অপটিক্যাল নজরদারি স্যাটেলাইট, লোটোস-এস১ ইলেকট্রনিক গোয়েন্দা স্যাটেলাইট, পিয়ন-এনকেএস সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থা ও কনডোর-এফকেএ রাডার-ইমেজিং স্যাটেলাইট। ইকেএস বা টুন্দ্রা ইনফ্রারেড আগাম সতর্কীকরণ স্যাটেলাইট বহরও পরীক্ষা করা হয়েছে।
ওবায়েদ বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি কোনো একটি রুশ স্যাটেলাইটের উপস্থিতি নয়, বরং সেগুলোর পরস্পরপূরক গোয়েন্দা সক্ষমতার ধারাবাহিকতা ও সমন্বয়।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রুশ সামরিক ভূ-স্থানিক ও সংকেত গোয়েন্দা তথ্য ইয়েমেনে হুতি অভিযানে সহায়তাকারী ইরান-নেতৃত্বাধীন গোয়েন্দা কাঠামোকে সহায়তা করেছে।
তাঁর মতে, এই গোয়েন্দা সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী বাস্তব উদাহরণ বাব আল-মান্দেবের দিকে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুতিদের আক্রমণ, যেখানে রাশিয়া থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য, ইরানি কমান্ড সমন্বয় ও স্থানীয় মানব গোয়েন্দা তথ্য একসঙ্গে প্রতিপক্ষ ইয়েমেনি বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রের সমন্বয় দ্রুত ভেঙে পড়তে ভূমিকা রেখেছে। গত সেপ্টেম্বরে হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়।
গত মাসে সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশনগুলোতে নিখুঁত হামলা চালায় হুতিরা। ওবায়েদ বলেন, সেপ্টেম্বরের ওই হামলায় পাইপলাইনের গুরুত্বপূর্ণ উঁচু পশ্চিম অংশে অবস্থিত তিনটি পাম্পিং স্টেশন—আফিফের পিএস৮, আল-ধেকরার পিএস৯ ও আল-মেসবাহর পিএস১১—বেছে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, এই নির্বাচন ওই অবকাঠামোর প্রকৌশলগত দুর্বলতা ও কৌশলগত গুরুত্ব সম্পর্কে গভীর ধারণারই প্রতিফলন।
তবে ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক এলাইজা ম্যাগনিয়ার সতর্ক করে বলেছেন, অরোরার অনুসন্ধান পুরো চিত্রটি নাও দেখাতে পারে। তাঁর মতে, কোনো গোয়েন্দা তথ্য আটকাতে না পারা থেকে এটা প্রমাণিত হয় না যে রুশ স্যাটেলাইটের তথ্য কার হাতে ছিল, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে তা ভাগ করেছে কি না, অথবা ইরান স্বাধীনভাবে তা সংগ্রহ করেছে কি না। তিনি সম্ভাব্য চারটি পরিস্থিতির কথা বলেছেন, যার প্রথমটি হলো রাশিয়া হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানের সঙ্গে তথ্য ভাগ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় অস্ত্রভান্ডার দখল, বাইরের সমর্থন ও ব্যাপক সামরিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে হুতিরা শক্তিশালী অস্ত্রভান্ডার গড়ে তুলেছে। সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিক স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে হুতিদের শত্রুতা গত জুলাই থেকে চলছে এবং সেপ্টেম্বরে হুতিদের লোহিত সাগর উপকূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তা আরও বেড়েছে।



