তেলুগু সিনেমায় বাড়ছে অন্য ভাষার সংগীত পরিচালকদের কাজ, নিজেদের সুর নিয়ে প্রশ্ন

তেলুগু সিনেমার বড় বাজেটের ছবিতে এখন ক্রমেই অন্য ভাষার সংগীত পরিচালকদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। অন্যদিকে, নিজেদের সংগীত পরিচালকেরা বড় প্রকল্পে কাজের সুযোগ পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। অতিরিক্ত কাজের চাপ, স্বল্প সময়ের মধ্যে সুর তৈরি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা মিলিয়ে তেলুগু সিনেমার সংগীতজগতে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে।
তেলুগু সিনেমার সংগীতের শক্তির উদাহরণ হিসেবে দুটি গানের কথা উল্লেখ করা হয়। ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আরিয়া’ সিনেমার ‘আ আণ্টে আমলাপুরম’ গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার যুগ আসার আগেই তেলুগুভাষী দর্শকদের গণ্ডি পেরিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। আর ২০২২ সালের ‘আরআরআর’ সিনেমার ‘নাটু নাটু’ গান জিতে নেয় অস্কার।
আলোচনায় বলা হয়েছে, তেলুগু সিনেমার অন্যতম উদ্বেগ হলো প্রতিষ্ঠিত সংগীত পরিচালকদের সংখ্যা সীমিত। জনপ্রিয় সংগীত পরিচালক দেবী শ্রী প্রসাদ গত কয়েক বছরে তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত বড় প্রকল্পে কাজ করেছেন। তার সাম্প্রতিক কাজের মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের ‘থান্ডেল’ ও ‘কুবেরা’, ২০২৪ সালের ‘পুষ্পা টু: দ্য রুল’ এবং আসন্ন ‘উস্তাদ ভগত সিং’।
অন্যদিকে, থামান এস এখনো ব্যস্ততম সংগীত পরিচালকদের একজন। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে তার নামের সঙ্গে যুক্ত প্রকল্পের সংখ্যা প্রায় ১৬। এসবের মধ্যে রয়েছে ‘গেম চেঞ্জার’ (২০২৫), ‘ডাকু মহারাজ’ (২০২৫), ‘দে কল হিম ওজি’ (২০২৫), ‘অখণ্ডা টু’, ‘দ্য রাজা সাব’ এবং ‘উস্তাদ ভগত সিং’। ভীমস সিসিরোলিও চিরঞ্জীবী ও ভেঙ্কটেশের মতো তারকার সিনেমায় বড় কাজের সুযোগ পেয়েছেন।
এক সাক্ষাৎকারে থামান বলেন, ২৪টি বিভাগের মধ্যে সংগীত হলো প্রযোজনার শেষ বিভাগ। সবকিছু শেষ হওয়ার পর সংগীতের কাজ শুরু হয়। সিনেমার কপি যদি দুই মাস আগে প্রস্তুত থাকে, তাহলে তিনি এক মাস আগে সংগীত দিতে পারেন বলে তিনি জানান। অর্থাৎ, সমস্যাটি সব সময় দক্ষতার অভাব নয়; প্রতিষ্ঠিত পরিচালকের সীমিত সংখ্যা, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও সময়ের স্বল্পতা মিলেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
গত দুই বছরে তেলুগু সিনেমার প্রতিষ্ঠিত ও তরুণ তারকাদের ২২টি প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অন্য ভাষার সংগীত পরিচালকদের উপস্থিতি বাড়ছে। অনিরুদ্ধ রবিচন্দর, রবি বসরুর, জি. ভি. প্রকাশ, সন্তোষ নারায়ণন, এ. আর. রহমান, জ্যাকস বিজয়, গোপী সুন্দর, বিশাল চন্দ্রশেখর এবং বি. অজানিশ লোকনাথের মতো সংগীত পরিচালকেরা তেলুগু সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ পাচ্ছেন।
বড় তারকাদের সিনেমায় এই প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্ট। জুনিয়র এনটিআর ‘দেবরা’ (২০২৪)-এ অনিরুদ্ধ রবিচন্দরের সঙ্গে কাজ করেছেন; তার পরবর্তী সিনেমা ‘ড্রাগন’-এ সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন রবি বসরুর। প্রভাসের ‘কল্কি ২৮৯৮ এডি’ (২০২৪)-তে কাজ করেছেন সন্তোষ নারায়ণন, ‘দ্য রাজা সাব’-এ রয়েছেন থামান, আর ‘ফৌজি’ ও ‘স্পিরিট’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন যথাক্রমে বিশাল চন্দ্রশেখর ও হর্ষবর্ধন রামেশ্বর।
আল্লু অর্জুনের ‘রাকা’ সিনেমায় রয়েছেন সাই অভ্যঙ্কর এবং ‘এএটুথ্রি’-এর সঙ্গে যুক্ত অনিরুদ্ধ। রামচরণের ‘পেদ্দি’ সিনেমায় সংগীত পরিচালনা করছেন এ. আর. রহমান। তবে মহেশ বাবু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম; তিনি এখনো থামান ও এম. এম. কীরাবাণীর সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তরুণ তারকাদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নানি ২০২৪ সালের ‘সারিপোধা সানিবারম’ সিনেমায় জ্যাকস বিজয়ের সঙ্গে কাজ করেছেন; তার পরবর্তী সিনেমা ‘দ্য প্যারাডাইস’-এ রয়েছেন অনিরুদ্ধ রবিচন্দর। বিজয় দেবরকোন্ডা ২০২৪ সালের ‘দ্য ফ্যামিলি স্টার’-এ গোপী সুন্দরের সঙ্গে, ২০২৫ সালের ‘কিংডম’-এ অনিরুদ্ধের সঙ্গে কাজ করেছেন, আর ‘রানাবালি’ সিনেমায় কাজ করছেন অজয়-অতুল জুটি।
পর্যালোচনা করা ২২টি প্রকল্পের মধ্যে ১০টি, অর্থাৎ প্রায় ৪৫ শতাংশ সিনেমার গল্প স্থানীয় পরিবেশ, জনগোষ্ঠী, ইতিহাস, লোককথা কিংবা পুরাণের সঙ্গে যুক্ত। ‘পুষ্পা’, ‘আরআরআর’, ‘দেবরা’, ‘থান্ডেল’, ‘রানাবালি’ ও ‘দ্য প্যারাডাইস’—সব কটিতেই নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রভাব রয়েছে। স্থানীয় গল্পের ছবিতে বাইরের সুরকারদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিই আলোচনায় বৈপরীত্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে বিষয়টিকে সরাসরি নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও আলোচনায় বলা হয়েছে। বাইরের সংগীত পরিচালকেরা নতুন সুর, প্রযুক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসতে পারেন। একই সঙ্গে তেলুগু সিনেমাতেও বিবেক সাগর, গৌরা হরি ও সিনজিত ইয়েরামিল্লির মতো প্রতিভাবান সংগীত পরিচালক রয়েছেন, তবে নতুনদের মধ্যে খুব কমসংখ্যকই বড় তারকাদের সিনেমায় ধারাবাহিকভাবে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।




