কৃষ্ণসাগরে বেসামরিক জাহাজে হামলা বন্ধের আহ্বান এরদোয়ানের, জেলেনস্কির সঙ্গে নতুন শস্য করিডোরে সমঝোতা
কৃষ্ণসাগরে বেসামরিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা বন্ধ করতে রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই পক্ষের প্রতিই আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। একই সঙ্গে তিনি ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ওই জলপথ দিয়ে নতুন একটি শস্য করিডোর চালুর কাজে এগিয়ে যেতে সম্মত হয়েছেন।
শনিবার ইস্তাম্বুলে জেলেনস্কির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এরদোয়ান বলেন, বেসামরিক জাহাজের ওপর হামলা অগ্রহণযোগ্য—যেই তা করুক না কেন। তাঁর ভাষায়, ‘বেসামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে হামলা এবং কৃষ্ণসাগরে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে এমন পদক্ষেপ কারও স্বার্থেই যায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে-ই এই হামলা চালাক বা যে যুক্তিই দেওয়া হোক, আমরা কোনো অবস্থাতেই তা মেনে নিতে পারি না। সব পক্ষকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানাচ্ছি।’
মস্কো ও কিয়েভ—দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখা তুরস্ক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় ক্ষুব্ধ। আঙ্কারা হামলা বন্ধে রাশিয়া ও ইউক্রেনের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে, তবে কোনো পক্ষই এখনো সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়নি বলে জানানো হয়েছে।
জেলেনস্কি রাশিয়াকে কৃষ্ণসাগরের পরিস্থিতি কঠিন করে তোলার জন্য দায়ী করেন। তিনি বলেন, এরদোয়ানের সঙ্গে তাঁর আলোচনার উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়েই ছিল কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা। জেলেনস্কি বলেন, ‘আজ আমি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সঙ্গে কৃষ্ণসাগর শস্য করিডোর নিয়ে কাজ করার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছি।’ তুরস্ক কৃষ্ণসাগরে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে বলেও তিনি জানান এবং সংলাপের জন্য তুর্কি নেতাকে ধন্যবাদ দেন।
এরদোয়ান বলেন, নিরাপদ নৌচলাচল ফিরিয়ে আনার আলোচনা অব্যাহত থাকবে। তাঁর ভাষায়, ‘আমি বিশ্বাস করি, এ বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারলে তা ইউক্রেনে টেকসই শান্তি নিশ্চিতের প্রচেষ্টাকেও নতুন গতি দেবে।’
একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, উভয় দেশের শস্য ও জ্বালানি চালান নিরাপদ করতে কৃষ্ণসাগরে সীমিত যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়ছে। জর্জিয়ার আটলান্টায় জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে রুবিও বলেন, শস্য চালান আবার সচল করতে তুরস্ক ও ভারতের প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তাঁর ভাষায়, ‘এটি বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা এবং কিছুটা জ্বালানি নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। আমরা এটি অর্জন করতে চাই। এতে যুদ্ধের সমাধান হবে না, তবে অন্তত এর একটি নির্দিষ্ট দিকের সমাধান হবে।’
কূটনৈতিক উপায়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টায় নতুন করে যে গতি এসেছে, তাকেও স্বাগত জানিয়েছেন এরদোয়ান; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এরদোয়ান বলেন, ‘এই পর্যায়ে আমরা মনে করি, ন্যায্য শান্তিতে কোনো পরাজিত পক্ষ থাকতে পারে না। শান্তির পথ সুগম করতে সম্ভাব্য সব প্রচেষ্টা চালাতে আমরা প্রস্তুত—এ কথা আমি জোর দিয়ে বলতে চাই।’
তুরস্ক এর আগেও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনার আয়োজন করেছে, যা দেখিয়েছে কূটনীতির মাধ্যমে বাস্তব ফল অর্জন সম্ভব বলে মন্তব্য করেন এরদোয়ান। তুর্কি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে এরদোয়ান বলেছেন, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করে যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টায় সহায়তা দিতে তুরস্ক প্রস্তুত।
অন্যদিকে ক্রেমলিন গত সপ্তাহে জানিয়েছে, রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরবর্তী দফা আলোচনা নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পুনরায় শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। জেলেনস্কি বলেন, তিনি এরদোয়ানের সঙ্গে সেই ফরম্যাটের পাশাপাশি তুরস্ক, ইউরোপ ও অন্যান্য অংশীদারদের সম্পৃক্ত করার মতো অন্যান্য বিকল্প এবং তুরস্কে একটি বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘শান্তির জন্য শক্ত সিদ্ধান্ত দরকার। আর সব পর্যায় থেকে রাশিয়াকে এই সংকেত পাঠানো প্রয়োজন যে শান্তির কোনো বিকল্প নেই এবং ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত থাকবে।’


