শিশু হাসপাতাল নিয়ে দুদকে অভিযোগ: নিয়োগ, পদোন্নতি ও রোগী পাঠিয়ে কমিশনের অভিযোগ
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট ঘিরে নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার এবং রোগী স্থানান্তরের বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তদন্ত চেয়ে পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. কে এম আজিজুল হকসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে নিয়োগে আর্থিক লেনদেন, অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং হাসপাতালের রোগীদের অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে কমিশন নেওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসপাতালের একটি প্রভাবশালী চক্রের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও চিকিৎসকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালটি পরিদর্শনে গিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম দেখতে পান। এ সময় নিজ কক্ষে ধূমপানরত অবস্থায় একজন চিকিৎসককে দেখতে পান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর ওই চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান।
২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে হাসপাতালের পরিচালনা বোর্ড গঠন করা হয়। এরপর বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. কে এম আজিজুল হকের সময়ে নেওয়া কয়েকটি নিয়োগ ও পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি ওঠে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৮ মে কয়েকজন চিকিৎসককে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তাদের যোগ্যতা ও শিক্ষাগত ডিগ্রি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন চিকিৎসক ২০১১ সালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত অবস্থায় চাকরি ছেড়ে চলে যান; পরে তাকে অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। ২০২৬ সালের আগস্টে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে কয়েকজনের পদোন্নতি নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এমনকি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ছাড়াই একজন চিকিৎসককে অধ্যাপক ও বোর্ডের সদস্য করার অভিযোগ রয়েছে।
গত ১০ অক্টোবর ৫০ জন চিকিৎসক, আয়া, ওয়ার্ড বয় ও পিওনসহ আরও ৫০ জন কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এসব নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন অভিযোগকারীরা। সহকারী পরিচালক (উন্নয়ন) পদে বয়সসীমা অতিক্রম করে প্রায় ৫০ বছর বয়সী একজনকে নিয়োগ এবং এ ক্ষেত্রে ২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসকের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। হাসপাতালের সাবেক কনসালট্যান্ট ডা. মো. আজহারুল ইসলামকে উপপরিচালক (হাসপাতাল) পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত পরিচালনা বোর্ডের ২২তম সভায় মাসিক ৭৫ হাজার টাকা বেতনে তাকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী কর্মরত জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে এ পদ পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।
রোগী স্থানান্তর নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, হাসপাতালের কিছু কর্মচারী ও চিকিৎসকের যোগসাজশে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং এ ক্ষেত্রে রোগীপ্রতি কমিশন নেওয়া হয়। শয্যা খালি নেই বা উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন, এমন কারণ দেখিয়ে শিশু রোগীদের স্বজনদের অন্য হাসপাতালে যেতে বলা হয়। কয়েকজন ওয়ার্ড মাস্টার, প্রশাসনিক কর্মচারী ও চিকিৎসক এ প্রক্রিয়ায় জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
চেয়ারম্যানের জন্য প্রশাসনিক ভবনের ১৩২(এ) নম্বর কক্ষ বরাদ্দ, সেখানে আসবাব কেনা ও আপ্যায়নের ব্যয় এবং হাসপাতালের গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক এলাকায় রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যালয় স্থাপনের বিষয়টিও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাসপাতালের আর্থিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৯৫০ চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বার্ষিক বেতন-ভাতায় প্রয়োজন ৬৬ কোটি টাকা; বিপরীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ পাওয়া যায় প্রায় ৩০ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে প্রতিষ্ঠানকে অভ্যন্তরীণ আয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে সিটি স্ক্যান ও এমআরআইয়ের মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. কে এম আজিজুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের সময় ধূমপানের ঘটনায় জড়িত চিকিৎসককে সেদিনই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রথমে আবেদন যাচাই-বাছাই, এরপর এমসিকিউ, ওএমআর পদ্ধতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন, লিখিত পরীক্ষা এবং উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। এখনো নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি, তাই লেনদেনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তিনি আরও বলেন, তিনি চেয়ারম্যান হওয়ার পর হাসপাতালের কোনো নিয়োগে এক পয়সাও লেনদেন হয়নি। হাসপাতালের কর্মকাণ্ড নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন, তারা দেশের ভালো চান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।




