বিধি না মেনে রায়ের আগেই সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ বেআইনি, বাতিল করল হাইকোর্ট
দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৮ আদেশের ৫ ও ৬ বিধির বাধ্যতামূলক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে রায় ঘোষণার আগেই সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেওয়াকে বেআইনি ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। অর্থ ঋণ আদালতের দেওয়া এমন একটি ক্রোকের আদেশ বাতিল করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ।
বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ একটি রিট পিটিশনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুল অ্যাবসোলিউট (চূড়ান্ত) ঘোষণা করে এই রায় দেন।
মামলার বিবরণে জানা যায়, একটি ব্যাংক বাদী হয়ে তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরীসহ আটজন বিবাদীর বিরুদ্ধে ১৪৮ কোটি ১৯ লাখ ২ হাজার ৮১০ টাকা দাবি করে ঢাকার অর্থ ঋণ আদালতে মামলা দায়ের করে। মামলাটি পরবর্তীতে স্থানান্তর হয়ে অর্থ ঋণ আদালত নং-৫, ঢাকায় পুনর্নম্বরকৃত হয়।
বিবাদীপক্ষ লিখিত জবাব দাখিল করার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৮ আদেশের ৫ বিধি এবং ১৫১ ধারা অনুযায়ী রায় ঘোষণার আগেই ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্রোকের দুটি আবেদন দাখিল করে। অর্থ ঋণ আদালত কোনো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি না করেই গত বছরের ১৮ নভেম্বর ক্রোকের আবেদন মঞ্জুর করেন।
ওই আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে বিবাদীদের একজন হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (নং ২৪৯৮/২০২৬) দায়ের করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রুল নিশি জারি করেন এবং ক্রোক আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। পরে বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া ও রিভিউ আবেদনের পর মামলাটি চূড়ান্ত শুনানির জন্য হাইকোর্ট বেঞ্চে ওঠে।
রিট পিটিশনারের পক্ষে আইনজীবী তাইসির হক শুনানিতে বলেন, ট্রায়াল কোর্ট ৩৮ আদেশের ৫ বিধির বিধান মোটেও অনুসরণ করেননি। বিধি ৫(১)-এর (ক) ও (খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সম্পত্তি হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট আশঙ্কা হলফনামা বা প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করার কথা থাকলেও ব্যাংক তার আবেদনে তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ক্রোকের আদেশের আগে বিবাদীকে জমানত দাখিল বা কারণ দর্শানোর যে বাধ্যতামূলক নিয়ম রয়েছে, ট্রায়াল কোর্ট তাও সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন।
অন্যদিকে ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী মারগুব কবি, তাঁর সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী তাইসির মাহমুদ, আদালতকে বলেন, বিবাদীরা ঋণ খেলাপি এবং তারা নিজেদের মধ্যে যোগসাজশে সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করছিলেন। ফলে ট্রায়াল কোর্টের দেওয়া ক্রোকের আদেশ সম্পূর্ণ আইনানুগ ও সঠিক ছিল বলে তাদের যুক্তি।
উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক ও মামলার নথি পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট বলেন, আদালতের সন্তুষ্টি এবং বিবাদীকে আইনি সুযোগ দেওয়ার বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে নিছক ভাসা-ভাসা যুক্তিতে কোনো ট্রায়াল কোর্ট এমন আদেশ দিতে পারেন না। পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, “আদালত প্রথমে বিবাদীকে সম্পত্তির মূল্য বা সমপরিমাণ জমানত দিতে অথবা কেন জমানত দেওয়া হবে না তার কারণ দর্শাতে নির্দেশ দেবেন। এই দুই বিকল্প পালনে ব্যর্থ হলেই কেবল আদালত ক্রোকের আদেশ দিতে পারেন।”
আদালত আরও বলেন, অর্থ ঋণ আদালতের বিচারক দেওয়ানি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট বিধিগুলো বা ব্যাংকের ক্রোকের আবেদনটি ভালোভাবে পর্যালোচনা না করেই অত্যন্ত ঢিলেঢালা ও অযৌক্তিক উপায়ে আদেশটি দিয়েছেন, যা আইনের দৃষ্টিতে টেকসই নয়। শেষে হাইকোর্ট রুলটি অ্যাবসোলিউট ঘোষণা করে অর্থ ঋণ আদালতের ক্রোক আদেশটি খারিজ করে দেন। তবে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যাংক উপযুক্ত মনে করলে পুনরায় নতুন করে আবেদন করতে পারবে বলেও জানান আদালত।



