সিনহা হত্যা মামলার আপিল শুনানি ১ ডিসেম্বর, মামলা এখন আপিল বিভাগে

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলাটি বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টের ধাপ পার হয়ে এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন। আপিলের শুনানির জন্য আগামী ১ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজ আদালত।
গত ১৮ অক্টোবর আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের চেম্বার জজ আদালত শুনানির এই দিন নির্ধারণ করেন। দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিত আসামিরা আপিল করেছেন।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সিনহা মো. রাশেদ খান। এ ঘটনায় তাঁর বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস হত্যা মামলা করেন।
২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালত রায়ে টেকনাফ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ওই রায়ে সাত আসামি খালাস পান।
২০২৫ সালের ২ জুন হাইকোর্ট প্রদীপ কুমার দাশ ও লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং অপর ছয় আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও বহাল রাখা হয়। হাইকোর্টের ৩৭৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, প্রদীপ কুমার দাশ ছিলেন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে সিনহার বুকে আঘাত করেন এবং গলায় পা দিয়ে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
রায়ে আরও বলা হয়, লিয়াকত আলী পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সরকারি পিস্তল দিয়ে নিরস্ত্র সিনহার শরীরের ঊর্ধ্বাংশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরপর চারটি গুলি করেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ওই গুলির আঘাতেই সিনহার মৃত্যু হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে বলে রায়ে বলা হয়।
রায় অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২ জুলাই সিনহা তাঁর ‘জাস্ট গো’ ইউটিউব চ্যানেলের জন্য ভিডিও ও স্থিরচিত্র ধারণ করতে কয়েকজন সহযোগীসহ কক্সবাজারে আসেন। কক্সবাজার, টেকনাফ ও রামুতে কাজ করার সময় তিনি স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে প্রদীপ ও তাঁর বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদা আদায়, গুম ও ক্রসফায়ারসহ বিভিন্ন বেআইনি কর্মকাণ্ডের অভিযোগ জানতে পারেন এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্যও ধারণ করেন।
রায়ে বলা হয়, বিষয়টি সোর্সের মাধ্যমে জানতে পেরে প্রদীপ সিনহাকে ওই কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে ও এলাকা ছেড়ে যেতে হুমকি দেন, এবং সিনহার গতিবিধির ওপর নজর রাখতে কয়েকজনকে সোর্স হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সিনহা ও তাঁর সহযোগী পাহাড় থেকে ফেরার সময় তাঁদের ডাকাত আখ্যা দিয়ে গণপিটুনিতে হত্যার উদ্দেশ্যে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টিও রায়ে তুলে ধরা হয়েছে।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকা ছয় আসামি হলেন পুলিশের সাবেক উপপরিদর্শক নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল রুবেল শর্মা ও সাগর দেব এবং মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আইয়াজ ও মো. নিজাম উদ্দিন। হাইকোর্টের মতে, তাঁদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সাধারণ অভিপ্রায়ের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলাটি হাইকোর্টে আসার পর দণ্ডিত আসামিরা আপিল ও জেল আপিল করেন, আর খালাসপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে এবং যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ছয় আসামির সাজা বাড়ানোর আবেদন করেন বাদী শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। ২০২৫ সালের ২ জুন হাইকোর্ট এসব আবেদন নিষ্পত্তি করে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইউনুস বলেছেন, সিনহা হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম বর্তমানে কক্সবাজারে নেই, মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আগামী ১ ডিসেম্বর আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হলে দণ্ডিত আসামিদের আপিলের বিষয়ে আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকবে বাদী ও আসামিপক্ষ।




