মিরপুর-গাজীপুর-আশুলিয়ায় দিনভর শ্রমিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে আগুন; মিরপুরে গ্রেপ্তার ১১

ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে রোববার (১ নভেম্বর) দিনভর ঢাকার মিরপুর, সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরের কোনাবাড়ি-কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। বিক্ষোভ চলাকালে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে, কারখানায় ভাঙচুর চালানো হয়েছে এবং মিরপুরে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে।
সকালে মিরপুরের পোশাক কারখানার শ্রমিকরা রাস্তায় বিক্ষোভে নামলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকাল ১১টার দিকে মিরপুর ১১ নম্বরে মেট্রো স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পরে দুপুর ১২টার দিকে সংঘর্ষ থামলে ওই এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
গাজীপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মাঠে নামে। সকাল থেকে কোনাবাড়ি, কালিয়াকৈর ও আশুলিয়াসহ আশপাশের এলাকায় শ্রমিকরা রাস্তায় নামেন এবং বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন কারখানায় ভাঙচুর চালিয়েছেন এবং পুলিশ বক্সে আগুন দিয়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মিরপুরে সংঘর্ষের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রাকিব খান।
ডিসি রাকিব খান বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কারও বাড়ি কক্সবাজার, কারও পটুয়াখালী, বরগুনা, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলায় এবং তাঁদের কেউ পোশাক কারখানার কর্মী নন। ফোনসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে তাঁরা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, সামনে পোশাক শ্রমিক, তার পেছনে ১০০ থেকে দেড়শো জনকে অনুসরণ করা হচ্ছিল; তারা ইসিবি চত্বর থেকে মিরপুর ১০ ও ১২ নম্বর পর্যন্ত আসেন, সেখান থেকে বেশ কয়েকজনকে ধরা হয়।
এদিকে পোশাক শ্রমিকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করলেও ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। শ্রমিকদের দাবি, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হোক।
চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উৎকণ্ঠা জানিয়েছে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। রোববার বিকেলে জরুরি বৈঠক শেষে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পোশাকশিল্পে চলমান বিশৃঙ্খলা ও কারখানা ভাঙচুর বন্ধ না হলে মালিকদের পক্ষে কারখানা চালু রাখা সম্ভব হবে না।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এখন পর্যন্ত একশোর মতো কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য পোশাক কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হবেন মালিকরা। তিনি বলেন, প্রকৃত শ্রমিকরা এই আন্দোলনে নেই; থাকলে প্রথম দিনই তা বন্ধ হয়ে যেত। এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য রয়েছে, যা সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে।
৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিকে যৌক্তিক মনে করছেন না মালিকরা। মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিন দফায় মজুরি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরপর ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি করা হলে অনেক মালিক তা দিতে পারবেন না এবং অনেক কারখানাই বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বোর্ড সব পক্ষের কথা বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণ করুক, এটাই মালিকদের প্রত্যাশা।
রোববার রাতে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, নিরীহ পোশাক শ্রমিকদের ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকে উসকানি দেওয়া হচ্ছে। দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যাহত করতে ষড়যন্ত্র চলছে এবং সরকার এ ধরনের তৎপরতা কঠোর হাতে মোকাবিলা করবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চলমান সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে প্রকৃত কোনো শ্রমিক বা শ্রমিক সংগঠন জড়িত নয়। বিভিন্ন পর্যায়ে মুখোশধারীরা আন্দোলনে ঢুকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির বিষয়টি শ্রমিক-মালিক আলোচনায়ই সমাধান করা যেত, সহিংস আন্দোলনের কোনো কারণ ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গার্মেন্টস মালিকদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কারখানা চালু রাখতে হবে এবং এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না, যাতে নতুন করে সংকট তৈরি হয়। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে কারখানার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন ও রপ্তানি বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।




