…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › জাতীয় › খবর
জাতীয়

আরিচা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক প্রকল্পে চার বছরেও হয়নি অভ্যন্তরীণ অডিট, ভুল নকশায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আরিচা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক প্রকল্পে চার বছরেও হয়নি অভ্যন্তরীণ অডিট, ভুল নকশায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত

এক হাজার ৬৩৫ কোটি ১০ লাখ টাকার আরিচা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার সাভার-নবীনগর ও টাঙ্গাইলের প্রধান মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ কমানো। কিন্তু বাস্তবায়নের শুরু থেকেই দায়িত্বশীলদের উদাসীনতা, খণ্ডকালীন জনবল দিয়ে কাজ চালানো এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ছাড়াই তৈরি ভুল নকশার কারণে আরিচা (বরঙ্গাইল)-ঘিওর-দৌলতপুর-নাগরপুর-টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়ক (আর-৫০৬) নিয়ে করা এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নানা অনিয়ম ও অসঙ্গতির চিত্র।

সড়ক বিভাগ জানিয়েছে, প্রকল্পের পূর্ত ও নির্মাণকাজ ১০টি প্যাকেজে (WP-01 থেকে WP-10) ভাগ করে চুক্তি করা হয়। মানিকগঞ্জ সড়ক বিভাগের আওতাধীন ১৭ দশমিক ৫০ কিলোমিটার সড়কের WP-01 প্যাকেজের চুক্তিমূল্য ৩০৩ কোটি ৫ লাখ টাকা। টাঙ্গাইল সড়ক বিভাগের আওতাধীন বাকি ৯টি প্যাকেজের মোট চুক্তিমূল্য ৫৯৬ কোটি ৩ লাখ টাকা; এর মধ্যে ৫ দশমিক ২৭৮ কিলোমিটার টাঙ্গাইল লিংক রোডের WP-02 প্যাকেজে ১১২ কোটি ৮২ লাখ, WP-03 প্যাকেজে ৫৯ কোটি ৫৬ লাখ, WP-04 প্যাকেজে ৬৪ কোটি, পাঁচটি সেতু নির্মাণে WP-09 প্যাকেজে ৪৪ কোটি ৯৭ লাখ এবং আরও পাঁচটি সেতুতে WP-10 প্যাকেজে ৩৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা ধরা হয়।

কোটি কোটি টাকার লেনদেন স্বচ্ছ রাখতে নিয়মিত অভ্যন্তরীণ অডিট বাধ্যতামূলক হলেও প্রকল্পের গত চার বছরে সড়ক ও জনপথ (সওজ) কর্তৃপক্ষ কোনো অভ্যন্তরীণ অডিট সম্পন্ন করেনি। ফলে হস্ত রশিদে বিল ছাড়ের মতো অনিয়ম ধামাচাপা পড়ে থাকে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক্সটার্নাল অডিট টিম মোট ২৪ কোটি ৯৭ লাখ ১০ হাজার ৫০১ টাকার ১০টি গুরুতর আপত্তি তোলে, যার ৯টি চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নিষ্পত্তিহীন রয়েছে।

বিধি অনুযায়ী এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পে সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রয়োজন। অথচ বাস্তবায়নের ৪ বছর ৪ মাসে কোনো পূর্ণকালীন পিডি ছিল না; তিনবার পিডি পরিবর্তন করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন কর্মকর্তা—মো. সবুজ উদ্দিন খান, সৈয়দ আসলাম আলী এবং বর্তমান পিডি এ কে এম আজাদ রহমান—সবাই সওজের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োজিত থেকে অতিরিক্ত দায়িত্বে প্রকল্প চালিয়েছেন।

উন্নয়ন পরিপত্র অনুযায়ী প্রতি তিন মাস পরপর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) মোট ১৭টি সভা হওয়ার কথা ছিল; প্রকল্প কর্মকর্তারা ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মাত্র ৬টি সভা করেছেন। পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশিকা অমান্য করে কোনো নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ পরামর্শক দিয়ে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও করানো হয়নি—সওজ নিজেরাই সংক্ষেপে সমীক্ষা শেষ করায় সড়কের পানিবিজ্ঞান ও কারিগরি নকশায় মারাত্মক ত্রুটি রয়ে গেছে।

নকশার ত্রুটির মধ্যে রয়েছে পিসি গার্ডার সেতুগুলোর সংযোগস্থলে ‘অ্যাপ্রোচ স্ল্যাব’ না রাখা—ফলে সেতুতে ওঠানামার সময় দ্রুতগতির যানবাহন প্রচণ্ড ঝাঁকুনির মুখে পড়বে এবং সেতুর ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মহাসড়কের মূল পেভমেন্ট ১০ দশমিক ৩০ মিটার চওড়া করা হলেও মাঝের পুরোনো সেতু ও কালভার্টগুলো আগের মতোই মাত্র ৭ দশমিক ৩০ মিটার সরু রেখে দেওয়া হয়েছে; এতে সরু সেতুর মুখে ‘বোতল-নেক’ ও মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

আন্ডারপাসের উচ্চতা রাখা হয়েছে মাত্র ৪ থেকে ৫ মিটার, ফলে ওভারলোডেড মালবাহী ট্রাক, ক্রেন ও ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি আটকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। টাঙ্গাইল থেকে আরিচাগামী যানবাহনের জন্য মূল জাতীয় মহাসড়কে (এন৫) কোনো বৈজ্ঞানিক ইউ-টার্ন রাখা হয়নি; রাখা হয়েছে কেবল একটি ঝুঁকিপূর্ণ মিডিয়ান ওপেনিং।

ঠিকাদারের সাইট ল্যাবে পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ নির্মাণসামগ্রীর জন্য নির্দিষ্ট ‘স্ট্যাক ইয়ার্ড’ বা রেজিস্টার রাখা হয়নি, মূল ল্যাব রেজিস্টারেও কোনো ব্যর্থ পরীক্ষার প্রতিবেদন নথিভুক্ত করা হয়নি—এতে অনুত্তীর্ণ নিম্নমানের রড ও পাথর গোপনে সড়কে ব্যবহারের পথ খুলে গেছে। সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের সময় বিকল্প ডাইভারশন সড়কে নিরাপত্তার জন্য কোনো ট্রাফিক সিগন্যালম্যানও নিয়োগ করা হয়নি; ফলে যানবাহন খাদে পড়া ও পথচারী দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে।

সওজ ও জেলা প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রতায় মানিকগঞ্জ অংশে ভূমি অধিগ্রহণে এক বছর ও টাঙ্গাইল অংশে ১৪ মাস বিলম্ব হয়। ব্যয় না বাড়লেও প্রকল্পের মেয়াদ ২৪ মাস বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জমি হারিয়ে চার বছর ধরে সরকারি ক্ষতিপূরণ না পেয়ে অনেকেই ভোগান্তিতে রয়েছেন।

নিলুয়া বিলের পাশ ঘেঁষে সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণে জলাভূমির পরিবেশ, পানিপ্রবাহ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা করেছেন স্থানীয়রা। মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক ইয়াসমিন বানু খন্দকার বলেন, সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে; নিলুয়া বিল বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হওয়ায় এতে মাছের প্রজনন ও জীবনচক্রে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. হাসিব মোহম্মদ আহসান বলেন, মহাসড়ক নির্মাণে শুধু সড়ক প্রশস্ত করলেই হবে না—সেতু, কালভার্ট, সংযোগস্থল ও যান চলাচলের নিরাপত্তা সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। প্রশস্ত সড়কের মাঝে সরু সেতু-কালভার্ট থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে; নকশায় ত্রুটি থাকলে তা নির্মাণের আগেই চিহ্নিত করে সংশোধন করতে হবে এবং নির্মাণ শেষ হলেও নিরাপত্তা মূল্যায়ন করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (ছাড়পত্র) মাহমুদ ইকবাল মো. শামীম বলেন, ইআইএ করা হলে পরিবেশগত ক্ষতি নিরূপণ করা যায়; এই প্রকল্প নিয়ে কেউ অভিযোগ দেয়নি, নিলুয়া বিল এলাকায় ক্ষতি হয়ে থাকলে লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টাঙ্গাইল থেকে সম্প্রতি বদলি হয়ে ঢাকা সড়ক বিভাগে যোগ দেওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী ড. সিনথিয়া আজমিরী খান বলেন, প্রতি বছর অভ্যন্তরীণ অডিট হয়ে থাকে; আইএমইডির প্রতিবেদনে অডিট হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে জানালে তিনি বলেন, ‘এমন হওয়ার কথা না, হয়তো তারা বুঝতে পারেননি।’ পরিবেশগত মূল্যায়ন ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি অনেক পুরোনো, তখন হয়তো এত গুরুত্ব দিয়ে ইআইএ দেখা হতো না এবং যেভাবে নকশা দেওয়া হয়েছে, সেভাবেই সড়ক ও সেতু নির্মাণ হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বড় উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর তদারকি অপরিহার্য; অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা না হওয়া, আপত্তি দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকা ও তদারকির ঘাটতি থাকলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা ও অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা। মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, প্রকল্পটি পুরোপুরি দেখভাল করছে সড়ক বিভাগ; কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতীয় বিভাগের আরও খবর

শ্রমিক বিক্ষোভে ৫২৯ পোশাক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, কর্মস্থল ছেড়েছেন প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক: বিজিএমইএ
জাতীয়

শ্রমিক বিক্ষোভে ৫২৯ পোশাক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, কর্মস্থল ছেড়েছেন প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক: বিজিএমইএ

পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও সাভার-আশুলিয়া এলাকার ৫২৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এ সময় প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজ…

মিরপুর-গাজীপুর-আশুলিয়ায় দিনভর শ্রমিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে আগুন; মিরপুরে গ্রেপ্তার ১১
জাতীয়

মিরপুর-গাজীপুর-আশুলিয়ায় দিনভর শ্রমিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে আগুন; মিরপুরে গ্রেপ্তার ১১

ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে রোববার (১ নভেম্বর) দিনভর ঢাকার মিরপুর, সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরের কোনাবাড়ি-কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক…

ছয় ঘণ্টা পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল শুরু, গাজীপুরে ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ
জাতীয়

ছয় ঘণ্টা পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল শুরু, গাজীপুরে ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ

শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রায় ছয় ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল শুরু হয়েছে। রোববার, ১ নভেম্বর, দুপুরের দিকে পুলিশ ও বিজি…

ই-রিকশার নতুন বিধিমালা: সোমবার থেকে ১৩ সিটি করপোরেশনে নিবন্ধন, ঢাকায় চলবে আট জোনে
জাতীয়

ই-রিকশার নতুন বিধিমালা: সোমবার থেকে ১৩ সিটি করপোরেশনে নিবন্ধন, ঢাকায় চলবে আট জোনে

রাজধানীসহ দেশের সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে নতুন বিধিমালা চালু করতে যাচ্ছে সরকার। সোমবার, ২ নভেম্বর থেকে দেশের ১৩…