…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › শিক্ষা › খবর
শিক্ষা

দিনাজপুর বোর্ডে এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়ের পূর্ণ চিত্র: ৪৯ প্রতিষ্ঠানে পাস করেনি কেউ, শুধু ইংরেজিতেই ফেল ৪৬ হাজার ৬৮৯

নিজস্ব প্রতিবেদক

রংপুর বিভাগে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে এ বছর ৬০ হাজার ৩৮৯ জন পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শুধু ইংরেজি বিষয়েই ফেল করেছেন ৪৬ হাজার ৬৮৯ জন। সব মিলিয়ে পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশে, যা বিভাগের প্রকাশিত গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে সর্বনিম্ন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্রটি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলে। বোর্ডের অধীন ৪৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই এবার পাস করতে পারেননি। বিপরীতে শতভাগ পাসের সাফল্য পেয়েছে মাত্র ৬টি প্রতিষ্ঠান।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) বেলা ১১টায় দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সই করা ফলাফলের পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়। পরে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. বোরহান উদ্দিন।

বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, রংপুর বিভাগের আট জেলার ৬৬৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এবার মোট ১ লাখ ১১ হাজার ৭৮৭ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫১ হাজার ৩৯৮ জন। সে হিসাবে অর্ধেকেরও বেশি পরীক্ষার্থী এবার উত্তীর্ণ হতে পারেননি।

গত বছরের তুলনায় এবার দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার কমেছে ১১ দশমিক ৫১ শতাংশীয় পয়েন্ট। ২০২৫ সালে এ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ২০২৪ সালে ছিল ৭৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৭৯ দশমিক ০৮ শতাংশ।

এবার দিনাজপুর বোর্ডের অধীনে বিভাগের আট জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৯৫৩ জন। তাঁদের মধ্যে ছাত্র ১ হাজার ৩৮৩ জন এবং ছাত্রী ১ হাজার ৫৭০ জন—জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতেও ছাত্রীরা ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছেন। এর আগে ২০২৫ সালে এ বোর্ডে ৬ হাজার ২৬০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন; অর্থাৎ এক বছরে সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

এবারের ফলাফলে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে ইংরেজি বিষয়। বোর্ডে এ বিষয়ে পাসের হার ৫৬ দশমিক ০৫ শতাংশ; অর্থাৎ ৪৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছেন। সংখ্যার হিসাবে শুধু এ বিষয়েই ফেল করেছেন ৪৬ হাজার ৬৮৯ জন।

ইংরেজিতে এমন বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যায় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, বোর্ডের অধীন অনেক কলেজেই অভিজ্ঞ ও দক্ষ ইংরেজি শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। যথাযথভাবে পাঠদান না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ফলাফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, করোনা মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের পাশাপাশি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলন ও অস্থিরতার কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে; এসবের প্রভাব তাঁদের প্রস্তুতি ও ফলাফলে পড়েছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইংরেজির এই ফলকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে জানান, বিষয়টি বোর্ড গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং ভবিষ্যতে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিভাগভিত্তিক ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো করেছেন—এ বিভাগে পাসের হার ৬৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অন্যদিকে মানবিক বিভাগে পাসের হার ৩৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে মাত্র ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

লিঙ্গভিত্তিক ফলাফলেও মেয়েরা এগিয়ে। ছেলেদের পাসের হার ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ, বিপরীতে মেয়েদের পাসের হার ৫০ দশমিক ২৬ শতাংশ। মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ২২ হাজার ১০৬ জন এবং ছাত্রী ২৯ হাজার ২৯২ জন।

জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ভিত্তিতে প্রকাশিত সেরা ৫০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় সবচেয়ে বেশি স্থান পেয়েছে রংপুর জেলার প্রতিষ্ঠান—এ জেলার ১২টি। দ্বিতীয় অবস্থানে দিনাজপুরের ১১টি; এ ছাড়া নীলফামারী ও লালমনিরহাটের ছয়টি করে, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের পাঁচটি করে, ঠাকুরগাঁওয়ের তিনটি এবং পঞ্চগড়ের দুটি প্রতিষ্ঠান তালিকায় রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শীর্ষে রংপুর সরকারি কলেজ: প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ২৭১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ২০৭ জন পাস করেছেন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪২৮ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ—৯৫৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৯৪৯ জন উত্তীর্ণ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩১০ জন। এ ছাড়া পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১২২ জন, কারমাইকেল কলেজে ১১৬ জন এবং দ্য মিলেনিয়াম স্টারস স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৬১ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। সামগ্রিক বিপর্যয়ের মধ্যেও রংপুর ক্যাডেট কলেজের ৪৭ জন পরীক্ষার্থীর সবাই উত্তীর্ণ হয়েছেন এবং প্রত্যেকেই জিপিএ-৫ পেয়েছেন।

অন্যদিকে শূন্য পাসের ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গত বছর ছিল ৪৩টি। এর মধ্যে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কান্দির হাট স্কুল অ্যান্ড কলেজ বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। এ বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে মানবিক বিভাগে মাত্র একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন—সঞ্জীব বর্মন নামের ওই পরীক্ষার্থী একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। গত বছরও প্রতিষ্ঠানটি থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেননি। প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রফিকুল বারী জানান, ২০১১ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি; অফিস সহায়কসহ বর্তমানে সেখানে মোট ১৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক নিরাপত্তার অভাবে ভালো শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তি হতে আগ্রহী হন না, ফলে শিক্ষার্থীসংখ্যা দিন দিন কমেছে।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক হারুন অর রশীদ চৌধুরীর মতে, ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া সামগ্রিক ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। তাঁর বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতি, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব, শ্রেণিকক্ষে অনিয়মিত উপস্থিতি এবং কার্যকর শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি। করোনায় সৃষ্ট শিক্ষাগত ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে না পারা এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতার প্রভাবও তিনি উল্লেখ করেছেন; শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে প্রাইভেটনির্ভরতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয়কেও তিনি শিক্ষার মান কমার সম্ভাব্য কারণ বলেছেন।

দিনাজপুর বোর্ডের এবারের ফলাফল শুধু পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার পরিসংখ্যান নয়; এটি আট জেলার কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার মান, শিক্ষকসংকট, পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি নিয়ে গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।

শিক্ষা বিভাগের আরও খবর

শিক্ষা

দিনাজপুর বোর্ডের জেলাভিত্তিক এইচএসসি ফল: শীর্ষে রংপুর, সব জেলায় ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে মেয়েরা

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার জেলাভিত্তিক ফলাফলে বড় ধরনের তারতম্য দেখা গেছে। বোর্ডের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আটটি জ…

পীরগঞ্জের গুর্জিপাড়া বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী মাত্র ৬ জন, শিক্ষক-কর্মচারী ১১
শিক্ষা

পীরগঞ্জের গুর্জিপাড়া বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী মাত্র ৬ জন, শিক্ষক-কর্মচারী ১১

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার গুর্জিপাড়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।…

এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়ের ধাক্কা উচ্চশিক্ষায়: স্নাতকে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ আসনই ফাঁকা থাকার আশঙ্কা
শিক্ষা

এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়ের ধাক্কা উচ্চশিক্ষায়: স্নাতকে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ আসনই ফাঁকা থাকার আশঙ্কা

চলতি বছর উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়ের কারণে স্নাতক ও সমমান পর্যায়ে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ আসনই ফাঁকা থাকবে। এতে জাত…

শিক্ষা

এসএসসি-এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েও অর্থের অভাবে অনিশ্চয়তায় কিশোরগঞ্জের ফারজানা

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের ফারজানা আক্তার এসএসসি ও এইচএসসি—দুই পরীক্ষাতেই জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে বিসিএসের মাধ্যমে …