সরকারি কাজে বদলাচ্ছে ঠিকাদার বাছাই: মানে ৮০, দামে ২০ নম্বর, নতুনদের জন্য শর্ত শিথিলের খসড়া

সরকারি দরপত্রে সবচেয়ে কম দর দিলেই আর কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকছে না। ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় দেশের ভেতরে উন্মুক্ত দরপত্রে নির্মাণকাজ ও ভৌত সেবা কেনার ক্ষেত্রে কাজের মান ও স্থায়িত্বের জন্য মোট নম্বরের ৮০ শতাংশ এবং দামের জন্য ২০ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে; দুই অংশের নম্বর মিলিয়ে এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানকেই কাজ দেওয়ার সুপারিশ করা হবে। একই খসড়ায় নতুন ও ছোট প্রতিষ্ঠান, নারী উদ্যোক্তা এবং লাইসেন্স থাকার পরও সরকারি কাজে অংশ নিতে না পারা ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের শর্ত সহজ করার বিধান রাখা হয়েছে।
১৩ পৃষ্ঠার খসড়াটিতে ৩৬টি ধারা রয়েছে। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) গত ২৯ অক্টোবর খসড়াটির ওপর জনমত আহ্বান করেছে। খসড়াটি সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে উত্থাপিত হতে পারে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, শুধু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, বেশি বার্ষিক লেনদেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা কিংবা আগে একটি বড় চুক্তির কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই বলে নতুন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ আটকে দেওয়া যাবে না। দরপত্রদাতার যোগ্যতা নির্ধারণে এমন শর্ত দেওয়া যাবে না, যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে নতুন নিবন্ধিত ব্যক্তি বা নবীন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ সীমিত করে।
তবে সব শর্ত তুলে দেওয়া হচ্ছে না। কাজের ধরন, জটিলতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় বিশেষ শর্ত আরোপ করা যাবে; অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় শর্তে কাউকে প্রতিযোগিতার বাইরে রাখা যাবে না, আবার কাজটি করার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও সক্ষমতাও দেখাতে হবে।
খসড়ায় ‘সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তি’ নামে একটি শ্রেণি রাখা হয়েছে—প্রস্তাবিত আইন কার্যকরের আগের সর্বোচ্চ ২০ বছরের মধ্যে বৈধ নিবন্ধন বা লাইসেন্স থাকার পরও প্রয়োজনীয় সুযোগ কিংবা অনুকূল পরিবেশের অভাবে যারা সরকারি ক্রয়ে অংশ নিতে পারেননি অথবা নেননি। সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তি এবং নতুন, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার যোগ্যতার শর্ত শিথিল করতে পারবে। তবে কাকে সুযোগবঞ্চিত গণ্য করা হবে, তার প্রমাণ ও যাচাইয়ের বিস্তারিত খসড়ায় নেই; তা বিধিতে নির্ধারণ করতে হবে।
সরকারি ক্রয় কার্যক্রম নিয়ে গঠিত কমিটির সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, বিদ্যমান শর্তের কারণে ঘুরেফিরে একই ঠিকাদারেরা দরপত্রে অংশ নিচ্ছেন, নতুন অনেকে অংশ নিতে পারছেন না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেছে; সব ধরনের ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও সরবরাহকারীর অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতেই এই সংশোধনের উদ্যোগ, এবং এর আলোকে সরকারি ক্রয় বিধিমালাও সংশোধন করা হবে।
আরেকটি বড় প্রস্তাব এলাকাভিত্তিক তালিকাভুক্তি। নতুন ও ছোট প্রতিষ্ঠানসহ সব শ্রেণির দরপত্রদাতাদের নিয়ে এলাকাভিত্তিক তালিকা করা হবে এবং নির্ধারিত মূল্যসীমার মধ্যে দেশের ভেতরে সরকারি কেনাকাটায় এই তালিকার ভিত্তিতে সীমিত দরপত্র আহ্বান বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে কত টাকা পর্যন্ত কেনাকাটায় নিয়মটি প্রযোজ্য হবে, তা খসড়ায় নেই—মূল্যসীমা বিধিতে ঠিক হবে। বিশেষায়িত বা কারিগরি কেনাকাটায় কার্যালয়প্রধানের অনুমোদন নিয়ে অন্য পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে। তালিকায় নাম উঠলেই কাজ মিলবে না; তালিকাভুক্তদের মধ্যেও প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হতে হবে। সীমিত দরপত্রে বর্তমানে জামানত বাধ্যতামূলক নয়; নতুন খসড়ায় বিধির মাধ্যমে জামানত রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
মূল্যায়নের পদ্ধতিও ধাপে ধাপে বদলাচ্ছে। প্রথমে কারিগরি প্রস্তাব যাচাই করা হবে—প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা ও সক্ষমতার পাশাপাশি কাজটি কীভাবে করা হবে, মান কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং কাজ কতটা টেকসই হবে, তা দেখা হবে। কারিগরি মূল্যায়নে উত্তীর্ণদের আর্থিক প্রস্তাব পরে খোলা হবে। এরপর মান ও স্থায়িত্বের নম্বরকে ৮০ শতাংশ এবং দামের নম্বরকে ২০ শতাংশ গুরুত্ব দিয়ে মোট নম্বর নির্ধারণ করা হবে; সবচেয়ে বেশি মোট নম্বর পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ করবে মূল্যায়ন কমিটি। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, মানে ৮০-এর মধ্যে ৭২ ও দামে ২০-এর মধ্যে ১৬ পেলে মোট হবে ৮৮; অন্য প্রতিষ্ঠান মানে ৬৪ ও দামে পুরো ২০ পেলেও মোট হবে ৮৪—তখন প্রথম প্রতিষ্ঠানই এগিয়ে থাকবে। মান ও দামের নম্বর মেলানোর ধারণা গত সেপ্টেম্বরের অধ্যাদেশেও ছিল, তবে সেখানে নির্দিষ্ট অনুপাত ছিল না; এবার সরাসরি ৮০:২০ অনুপাতের প্রস্তাব এসেছে।
দরপত্রের দলিলে মূল্যায়নের মানদণ্ড আগেই জানাতে হবে এবং মূল্যায়ন কমিটিকে তা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বাস্তবায়নের যোগ্যতা ও আর্থিক সামর্থ্যও চূড়ান্ত সুপারিশের আগে যাচাই করা হবে। এই বিশেষ ব্যবস্থার বাইরের অন্যান্য কেনাকাটায় সর্বনিম্ন মূল্যায়িত যোগ্য দরপত্রদাতা নির্বাচনের বিধান বহাল থাকবে।
দরের সীমা নিয়েও কড়া প্রস্তাব রয়েছে। দেশের ভেতরে উন্মুক্ত দরপত্রে নির্মাণকাজ ও ভৌত সেবার ক্ষেত্রে দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ১০ শতাংশের বেশি কম বা বেশি দর দিলে তা বাতিল হবে। অর্থাৎ কোনো কাজের সরকারি হিসাব ১০ কোটি টাকা হলে গ্রহণযোগ্য দরের সীমা হবে ৯ কোটি থেকে ১১ কোটি টাকা। নির্মাণকাজে আগে এই ১০ শতাংশের সীমা ছিল; ২০২৫ সালের সংস্কারে তা তুলে দেওয়া হয়, পরে অস্বাভাবিক কম দর যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এবার সীমার বাইরের দর সরাসরি বাতিলের প্রস্তাব এসেছে, ফলে সরকারি দপ্তরের ব্যয়ের হিসাবই প্রথম ধাপে ঠিক করে দেবে কোন দরগুলো প্রতিযোগিতায় থাকবে।
খসড়ায় সরকারি কেনাকাটায় দেশে উৎপাদিত পণ্যকে অগ্রাধিকার এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির দেশীয় পণ্য কেনা বাধ্যতামূলক করার ক্ষমতা সরকারকে দেওয়ার বিধানও রয়েছে। বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি ক্রয়ে অংশ নিতে চাইলে বাংলাদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গঠন করতে হবে। দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি, আঁতাত, জবরদস্তি কিংবা কাজে ব্যর্থতার কারণে নির্দিষ্ট মেয়াদে সরকারি ক্রয়ে অংশ নেওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে, তবে সিদ্ধান্তের আগে অভিযোগ জানিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী কাজ বুঝে নেওয়ার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের অবহেলা বা ব্যর্থতার জন্যও জবাবদিহির বিধান রয়েছে।
এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ গেজেটে প্রকাশ করা হয়। এবার ওই অধ্যাদেশের অধিকাংশ বিধান বহাল রেখে আরও কিছু পরিবর্তনসহ দ্বিতীয় সংশোধনী আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে; খসড়ায় আগের অধ্যাদেশটি রহিত করার প্রস্তাবও রয়েছে।
সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ, বর্তমানে বিপিপিএ) সাবেক মহাপরিচালক ও সরকারি ক্রয়বিশেষজ্ঞ মো. ফারুক হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন কাজ না পাওয়ার কারণকে শুধু রাজনৈতিক বঞ্চনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; নিয়ম অনুযায়ী অংশ নেওয়া ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা দেখাতে পারার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। ই-জিপি চালু থাকায় দরপত্র জমায় সরাসরি বাধা দেওয়ার সুযোগও কমেছে, তবে অংশগ্রহণে কাউকে বৈষম্যের শিকার হতে দেওয়া যাবে না। তিনি আরও বলেন, নতুনদের সুযোগ বাড়াতে গিয়ে বিশেষ কাউকে অন্যায্য সুবিধা দেওয়া যাবে না; তালিকাভুক্তি ও ঠিকাদার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকলে কাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ ও কাজের মান—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।



