বদলে যাচ্ছে শীতের চেনা ছন্দ: দেরিতে আসছে শীত, সঙ্গে বাড়ছে ধোঁয়াশা আর ফসলের ঝুঁকি

শিশিরভেজা ঘাস, কুয়াশায় ঢাকা পথঘাট, ভোরের হিমেল বাতাস আর খেজুরের রস সংগ্রহে গাছিদের ব্যস্ততা—একসময় অগ্রহায়ণের শুরুতেই প্রকৃতি জানান দিত শীতের আগমনী বার্তা। পৌষ-মাঘে শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠানে রোদ পোহানো, ভাপা-চিতই পিঠার ঘ্রাণ আর ঘন কুয়াশায় মোড়ানো সকাল হয়ে উঠত বাংলার চিরচেনা শীতের প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই পরিচিত দৃশ্যপট। অগ্রহায়ণ পেরিয়েও অনেক সময় গরমের অনুভূতি কাটে না। দিনের বেলায় কোথাও কোথাও ফ্যান কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালাতে হয়। আবার শীতের তীব্রতা অনুভূত হয় দেরিতে—কখনো পৌষের শেষদিকে, কখনো মাঘের মাঝামাঝি।
বাংলাদেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল হিসেবে বিবেচিত হয়। এ সময় তাপমাত্রা কমে আসে, বাতাসের আর্দ্রতা ও কুয়াশার ধরনে পরিবর্তন দেখা যায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শীতের আগমন, স্থায়িত্ব ও তীব্রতায় অনিয়মের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কোনো বছর শীত দেরিতে আসে, কোনো বছর অল্প সময়ের জন্য তীব্রতা দেখিয়ে আবার কমে যায়। আবার কোথাও কয়েক দিনের শৈত্যপ্রবাহের পরই তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট জলবায়ু পরিবর্তন। রিসার্চ সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ (আরসিসিসি) প্রকাশিত ২০২৪ সালের বাংলাদেশবিষয়ক জলবায়ু তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, ১৯৬১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে গড় বার্ষিক তাপমাত্রা প্রতি দশকে প্রায় ০ দশমিক ১ থেকে ০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। দীর্ঘ সময়ের এই পর্যবেক্ষণ দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতাকেই নির্দেশ করে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ‘চেঞ্জিং ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও ১৯৮০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার তাপমাত্রা নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৯৮০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত শীতকালে গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রতি দশকে প্রায় ০ দশমিক ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির প্রবণতা পাওয়া গেছে। তবে এই পরিসংখ্যান ঢাকাকেন্দ্রিক; একে পুরো দেশের শীতকালীন তাপমাত্রার পরিবর্তনের চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও এসব গবেষণা থেকে বোঝা যায়, জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন শীতের পরিচিত বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বছরে শীত দেরিতে আসা বা কম অনুভূত হওয়ার পেছনে বায়ুপ্রবাহ, মেঘের উপস্থিতি, কুয়াশা ও আঞ্চলিক আবহাওয়াগত পরিস্থিতিরও ভূমিকা থাকে। তাই একটি বা দুটি শীতের অভিজ্ঞতা দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পূর্ণ চিত্র ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
শীতের সকাল মানেই একসময় ছিল ঘন কুয়াশায় মোড়ানো প্রকৃতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেক শহর ও শিল্পাঞ্চলে শীতের সকালের চিত্র বদলে গেছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক কুয়াশার সঙ্গে বায়ুদূষণজনিত ধোঁয়াশা মিশে যাওয়ায় অনেক সময় দুটির পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
শীতকালে বাতাসের গতিবেগ কমে যাওয়া, বৃষ্টিপাতের স্বল্পতা এবং বায়ুমণ্ডলের স্থিতিশীল অবস্থার কারণে দূষিত কণা সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। এর সঙ্গে যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটার নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলা ও শিল্পকারখানার দূষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে অনেক এলাকায় শীতের নির্মল বাতাসের পরিবর্তে মানুষকে দূষিত বায়ুতে শ্বাস নিতে হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘অ্যাম্বিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি ইন বাংলাদেশ’ প্রতিবেদনে শীতকালে বায়ুদূষণের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রীষ্মের তুলনায় শীতকালে আগারগাঁওয়ে পিএম ২ দশমিক ৫-এর ঘনত্ব ২৮ শতাংশ এবং নারায়ণগঞ্জে ৭৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে। সাভারে এ বৃদ্ধির হার প্রায় ৬৩ শতাংশ। অর্থাৎ শীত শুধু তাপমাত্রা কমার ঋতু নয়, অনেক এলাকায় এ সময় বায়ুদূষণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
দূষিত বায়ুর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগা মানুষের ওপর। ফলে শীতের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নির্মল বায়ু নিশ্চিত করাও এখন বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষির সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। শীতের তাপমাত্রা, কুয়াশা, শিশির ও সূর্যালোকের ওপর অনেক ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নির্ভর করে। তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা, অনিয়মিত শীত কিংবা দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা ফসলের বৃদ্ধি ও উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে।
শীতকালীন সবজি, আলু, সরিষা ও অন্যান্য ফসলের জন্য নির্দিষ্ট আবহাওয়াগত পরিস্থিতি প্রয়োজন। তাপমাত্রা বেশি থাকলে কোনো কোনো ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। আবার অতিরিক্ত কুয়াশা ও আর্দ্রতা কিছু ফসলে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। এতে কৃষকদের উৎপাদন পরিকল্পনা ও চাষাবাদের কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হয়।
শুধু কৃষিই নয়, আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে জীববৈচিত্র্যেও। শীতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনচক্র তাপমাত্রা ও ঋতুর পরিবর্তনে প্রভাবিত হতে পারে। পরিযায়ী পাখির আগমন, বিচরণ ও খাদ্যসংগ্রহের ক্ষেত্রেও আবহাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
শীতের এই আবহ হারিয়ে যাওয়ার পেছনে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনই দায়ী নয়। নগরায়ণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ক্রমবর্ধমান দূরত্বও এর অন্যতম কারণ। তবু ঋতুর স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন এলে মানুষের জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক অভ্যাসেও তার প্রভাব পড়ে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৈশ্বিক পর্যায়ে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়েও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ, বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ, জলাশয় রক্ষা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে যানবাহন ও শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মাণকাজের ধুলাবালি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।



