সৈয়দপুরে দেড় লাখ টাকা দিয়েও চেয়ারম্যান হতে পারেননি হোসনেয়ারা, সালিসে ফাঁস করলেন সচিবসহ ছয়জনের নাম

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের শূন্য পদে দায়িত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক নারী ইউপি সদস্যের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পরিষদের সচিবসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারী হোসনেয়ারা কামারপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য এবং প্যানেল চেয়ারম্যান। টাকা দিয়েও তিন মাসে চেয়ারম্যান হতে না পেরে তিনি টাকা ফেরত চান।
স্থানীয় বিএনপি নেতা, ইউপি সদস্য ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এক সালিসি বৈঠকে হোসনেয়ারা দাবি করেন, চেয়ারম্যান বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সচিবসহ ছয়জন তার কাছ থেকে মোট দেড় লাখ টাকা নিয়েছেন। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
হোসনেয়ারার অভিযোগ অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোকছেদুল ইসলাম নিয়েছেন ৫০ হাজার টাকা, সদ্য বরখাস্ত হওয়া চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী মাসুদ ৫০ হাজার, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোরসালিন ২০ হাজার, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আলিম ১০ হাজার, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জলিল ১০ হাজার এবং ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য মোসলেমা ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন।
হোসনেয়ারা বলেন, এখন পদও নেই, টাকাও নেই। এ অবস্থায় বিভিন্নজনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি, কিন্তু কোনো সুরাহা হচ্ছে না।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সালিসি বৈঠকের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে রাতের আঁধারে ইউনিয়ন পরিষদের রেজুলেশন বই সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন সচিব মোকছেদুল ইসলাম। এ কাজে গ্রাম পুলিশকে ব্যবহার করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি। গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকালে এ ঘটনায় এক গ্রাম পুলিশকে হাতেনাতে ধরার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) মানিক বলেন, সচিব তাকে চাবি দিয়ে রেজুলেশন বই নিয়ে সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর সরকারের কাছে যেতে বলেন।
এদিকে ওই রাতেই গোপনে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান-২ জালাল উদ্দীনকে চেয়ারম্যান করার বিষয়ে রেজুলেশন তৈরি করে রোববার সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জালাল উদ্দীন বলেন, নিয়ম অনুযায়ীই তিনি চেয়ারম্যান হচ্ছেন। তার দাবি, এক নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যান আলালের বিরুদ্ধে ভিডব্লিউবি কর্মসূচির উপকারভোগীদের সঞ্চয়ের টাকা নিজের কাছে রাখার অভিযোগ রয়েছে, আর প্যানেল চেয়ারম্যান-৩ হোসনেয়ারার বিরুদ্ধেও সচিবসহ বিভিন্নজনকে দেড় লাখ টাকা দিয়ে অনিয়ম করার অভিযোগ রয়েছে।
ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেন, সচিব মোকছেদুল ইসলাম কামারপুকুর ইউনিয়নেরই বাসিন্দা। তার বিরুদ্ধে আগেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তার ছেলের নামে প্রতিবন্ধী ভাতা করাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে তাকে একসময় জেলার কিশোরগঞ্জে বদলি করা হয়েছিল, পরে তিনি আবার নিজ ইউনিয়নে কর্মরত হন। অতিরিক্ত ফি আদায়সহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও তোলেন আমিনুল।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সচিব মোকছেদুল ইসলাম বলেন, তিনি কোনো টাকা নেননি। হোসনেয়ারা তার টেবিলের ড্রয়ারে পাঁচ হাজার টাকা রেখে গিয়েছিলেন, তা তিনি একটি কাজে খরচ করে ফেলেছেন এবং দ্রুতই তা ফেরত দিয়ে দেবেন। আর অন্য কেউ টাকা নিয়েছে কি না, তা তার জানা নেই।
সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর সরকার বলেন, চৌকিদার তার নাম কেন বলেছে, তিনি কি তাকে আসতে বলেছেন—এ ব্যাপারে তিনি চৌকিদারের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করবেন। ইউনিয়ন পরিষদের কোনো বিষয়েই তার মাথাব্যথা নেই, আর কোনো ঘটনার সঙ্গে তাকে জড়িয়ে কেউ কিছু বললে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহা ফাতেহা তাকমিলা বলেন, বিষয়টি তারা তদন্ত করে দেখছেন। সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে তিনি কোনোভাবেই এমন কাজে জড়িত হতে পারেন না, তাই প্রাথমিকভাবে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হতে পারে।




