…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › আইন ও অপরাধ › খবর
আইন ও অপরাধ

নয় মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার অন্তত ১৬ জন, আসকের হিসাব; আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ মন্তব্যে ভবিষ্যৎ আইনি ঝুঁকির আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অন্তত ১৬ জন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে গ্রেপ্তারের আগেই পুলিশ সদস্যদের শারীরিক নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছেন দুজন এবং গ্রেপ্তারের পর ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে আরও চারজনের। এ ছাড়া গ্রেপ্তারের আগে গোলাগুলির ঘটনাতেও প্রাণহানির তথ্য রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের বর্তমান মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের মন্তব্য নতুন করে উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গত ২৬ অক্টোবর সকালে রাজধানীর চকবাজারের শাহজাহান ইমাম টাওয়ারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইজিপি বলেন, ‘পুলিশ কঠোর হলে বলা হয় “ফ্যাসিস্ট পুলিশ”, আবার নীরব থাকলে বলা হয় “দুর্বল পুলিশ”। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার যদি অনুমতি দেয় এবং প্রয়োজন হয়, তবে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না।’ তাঁর এই বক্তব্যের পর সমালোচনার মুখে পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তবে তাঁর জবাবদিহি ও পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইজিপির এ ধরনের মন্তব্য সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এবং সংবিধান, মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা, কোনো অবস্থাতেই বিচারবহির্ভূতভাবে শাস্তি কার্যকর করা নয়।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা বা নির্দেশনার প্রমাণ না থাকলেও আইজিপির এই বক্তব্য ভবিষ্যতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য আইনি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁর বক্তব্যের পর সরকারের অবস্থান, পরবর্তী পদক্ষেপ এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, সেসব বিষয় ভবিষ্যতের কোনো বিচারিক অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন।

তাঁরা আরও বলছেন, এমন বক্তব্যের পরও আইজিপিকে দায়িত্বে বহাল রাখা হলে সরকারের অবস্থান নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে এবং জনপরিসরে এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে যে সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নীরব অথবা এ ধরনের বক্তব্যকে পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দিচ্ছে। ভবিষ্যতে আইনি বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় আইজিপির বক্তব্যটি রাষ্ট্রীয় অবস্থান, প্রশাসনিক মনোভাব কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জ্ঞাতসারের বিষয় মূল্যায়নে রেফারেন্স হিসেবেও উপস্থাপিত হতে পারে।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২ হাজার ৬৯৩ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৬৩০ জন, কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৪৮ জনের, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অন্তত ১৩৩ জন এবং রাষ্ট্রীয় মদদে জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন ৬৮৪ জন।

আসকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে প্রাণ দিয়েছেন অন্তত ৩৮ জন, যাঁদের মধ্যে শুধু পুলিশের হাতেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ জন। আর ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত, গণ-অভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ড বাদে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অন্তত ২১ জন, যাঁদের মধ্যে পুলিশের হাতে নিহত ১১ জন।

সাবেক জ্যেষ্ঠ আমলা ও সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের বিশ্লেষক মো. শেখাবুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘রাষ্ট্র ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও সংযত হওয়া উচিত।’ তিনি বলেন, পুলিশের আইজিপির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির অসতর্ক বক্তব্য সরকারের জন্য অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে এবং সরকারের মানবাধিকারবিষয়ক অবস্থান, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, ‘আইজিপির এই বক্তব্য বর্তমান সরকারকে ভবিষ্যতে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি সংকটের মুখে ফেলতে পারে। কারণ, পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার মুখে সরকারের অনুমতি-সাপেক্ষে ক্রসফায়ারের কথা বলা হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায় কি সরকারও গ্রহণ করছে?’ তিনি বলেন, হাসিনা সরকারের আমলে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে যে ধরনের সমালোচনা ও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়েছে, বর্তমান সরকারের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আইজিপি যেটা বলেছেন, সেটা একটা ভয়াবহ বক্তব্য। তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি এটা প্রমাণ করেছেন যে অতীতে যেসব ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ নানা ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো ওপরের নির্দেশেই হয়েছে।’ তিনি আন্তর্জাতিক আইনে ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাধারণত ওপরের পর্যায়ের নির্দেশনা ছাড়া হয় না এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটলে সেই দায়দায়িত্ব সরকারের উচ্চপর্যায়ের দিকেও যাবে। তাঁর মতে, এমন বক্তব্য দেওয়ার পর আইজিপির এই পদে থাকার কোনো অধিকার নেই।

সাবেক সচিব ও লেখক একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, আইজিপির বক্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা অপরিহার্য এবং কোনো বক্তব্য বা পদক্ষেপের কারণে যেন ভবিষ্যতে সরকার কিংবা রাষ্ট্রকে আইনি জটিলতায় পড়তে না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইজিপির বক্তব্যের মূল তাৎপর্য ছিল আইনের সীমার মধ্যে থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুলিশ সদস্যদের পেশাগত আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন—এই দুই অবস্থান সাংঘর্ষিক। কোনো সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধ করতে পারে না।’ মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেছেন, আইনশৃঙ্খলার অবনতির দায় ক্রসফায়ারের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা আইনের চরম বরখেলাপ।

ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি এবং এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জিরো টলারেন্স বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সস্তা বাহবা ও ক্রেডিট নেওয়ার জন্য আইজিপির দেওয়া বক্তব্য দেশের ক্ষতি করবে এবং সরকারকে স্বস্তির বদলে বিব্রত ও ভীত করবে। বিশেষজ্ঞরা অতীতের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে বলছেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গুম, ক্রসফায়ার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ঘিরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা ও দায় নিয়ে দেশে-বিদেশে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল; অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সরকার এখনই সুস্পষ্ট অবস্থান না নিলে ভবিষ্যতে সরকার ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদেরও কঠিন আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

আইন ও অপরাধ বিভাগের আরও খবর

খুলনায় তাঁতি দল নেতা হুমায়ুন কবির হত্যায় মামলা, গ্রেপ্তার ১
আইন ও অপরাধ

খুলনায় তাঁতি দল নেতা হুমায়ুন কবির হত্যায় মামলা, গ্রেপ্তার ১

খুলনা মহানগর তাঁতি দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবিরকে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং এজাহারভুক্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।…

আইন ও অপরাধ

দুদকের মামলায় ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের এমডি দিলীপ আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দিলীপ কুমা…

আইন ও অপরাধ

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আমুসহ আওয়ামী লীগের ৭ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ

চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেকমন্ত্রী আমির হোসেন আমুসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্য…

আইন ও অপরাধ

বগুড়ার ধুনটে ধর্ষণ মামলার দুই মাসেও মেডিকেল পরীক্ষা হয়নি, তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ

বগুড়ার ধুনটে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করার প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগী এক বিধবা নারীর মেডিকেল পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়নি বল…