পোশাক খাতে ষড়যন্ত্র হলে কঠোর ব্যবস্থা, সচিবালয়ে মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর; মিরপুর-গাজীপুরে আজও অবরোধ-সংঘর্ষ

গার্মেন্টস খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি কিংবা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কেউ ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সোমবার (২ নভেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে গার্মেন্টস মালিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। এদিকে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে এদিনও রাজধানীর মিরপুর এবং গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সীমান্তের ওপার থেকে ইশারায় কেউ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করা হবে। যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের এসব থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’ তিনি জানান, গার্মেন্টস খাতে সম্ভাব্য অস্থিরতা সম্পর্কে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল; গত মাসের ১৮ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শ্রম মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছিল।
এর আগে এদিন সকালে গার্মেন্টস খাতের চলমান পরিস্থিতি, সংকটের কারণ এবং তা নিরসনে করণীয় নিয়ে গার্মেন্টস মালিক নেতারা সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।
মাঠের পরিস্থিতিতে, সকাল সোয়া ৯টার দিকে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় শ্রমিকেরা সংগঠিত হয়ে সড়কে নামার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয় এবং সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিপেটা ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে; জবাবে শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান বলেন, ‘শ্রমিকেরা রাস্তা অবরোধ করতে এসেছিল। আমরা তাদের সরিয়ে দিয়েছি।’
মিরপুর-১০ গোলচত্বর থেকে ধাওয়া খেয়ে শ্রমিকেরা মিরপুর-২ নম্বর এলাকার দিকে সরে যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শ্রমিকেরা সেখানে বিভিন্ন অলিগলিতে অবস্থান নিয়ে থেমে থেমে রাস্তায় নেমে অবরোধের চেষ্টা করেন এবং পুলিশ দেখামাত্রই ধাওয়া দেয়। বেলা ১১টার দিকে তাঁরা সংগঠিত হয়ে রাস্তায় নামলে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে; পরে তাঁরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এ সময় একটি বাস ভাঙচুরের চেষ্টাও চালানো হয়। পুরো মিরপুরজুড়েই পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে, এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।
মিরপুর-১০ ও এর আশপাশের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে, সড়কে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছে। এর আগে গতকাল রোববারও একই এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
অন্যদিকে সকাল থেকে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী, সফিপুর, মৌচাক, পল্লী বিদ্যুৎ এবং ভোগড়া বাইপাস এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিলে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ ও মৌচাক এলাকায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন; একপর্যায়ে তাঁরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন এবং এ সময় বিভিন্ন যানবাহন ও দোকানপাটে ভাঙচুর চালানো হয়। ভোগড়া বাইপাস এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করা হলে বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছেন। শিল্প এলাকার নিরাপত্তায় বিভিন্ন কারখানার সামনে শিল্প পুলিশ ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অসন্তোষের কারণে সকাল ৮টা থেকেই কোনাবাড়ী ও সফিপুরসহ বিভিন্ন এলাকার একাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয় এবং আন্দোলন ও উত্তেজনার মুখে কোনাবাড়ী, সফিপুর ও মৌচাকসহ একাধিক এলাকার কারখানাগুলোতেও ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন বলেন, ‘গতকাল গাজীপুরের শতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। আজও বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ চলছে। বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।’
এদিকে সাভারের আশুলিয়ায় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে; এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। শিল্প পুলিশ-১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশনস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স) শোয়েব আহম্মেদ বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের প্রধান দাবি সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা। বিক্ষোভরত এক শ্রমিক বলেন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও আমাদের মজুরি সে অনুযায়ী বাড়েনি। একটি গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতেই খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। শুধু মজুরি বোর্ড গঠন করলেই হবে না, আমাদের বেতন কত নির্ধারণ করা হয়েছে তা দ্রুত ঘোষণা করতে হবে।’ সহিংসতার বিষয়ে শ্রমিকদের দাবি, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছেন এবং কারখানা ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকেরা জড়িত নন; আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে ‘বহিরাগত’ কিছু লোক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করছে বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।
শ্রমিক বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মালিক-শ্রমিকসহ সব পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় এদিন লাঠি হাতে বিএনপি নেতাকর্মীদেরও অবস্থান করতে দেখা গেছে। গতকাল সরকার কঠোরভাবে সহিংসতা দমনের ঘোষণা দেওয়ার পর তাঁদের সড়কে দেখা গেল। লাঠিসোঠা হাতে সরকারদলীয় কর্মীরা পুলিশের সামনেই মিরপুর-১০ থেকে ২ নম্বরের রাস্তায় শোডাউন দেন; তাঁরা বলছেন, তাঁরা সাধারণ মানুষদের কিছু বলছেন না, আন্দোলনের নামে যারা ভাঙচুর করবে ও আগুন দেবে তাদের প্রতিহত করতে মাঠে নেমেছেন।



