মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দলের ভরাডুবির পুরোনো ধারা: ২০ বারের মধ্যে ১৮ বারই আসন হারিয়েছে হোয়াইট হাউসের দল
যুক্তরাষ্ট্রে মঙ্গলবার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোটাররা প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) সব ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে প্রতিনিধি বেছে নেবেন। আগামী দুই বছর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা ঠিক হবে এই ভোটেই।
ব্যালটে প্রেসিডেন্টের নাম না থাকলেও এই ভোটকে প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর গণরায় হিসেবেই দেখা হয়, আর ইতিহাস বলছে, প্রায় সব সময়ই তার মূল্য দিতে হয় প্রেসিডেন্টের দলকে। ১৯৪৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ১৮টিতেই হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণে থাকা দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারিয়েছে। গড়ে হারানো আসনের সংখ্যা ২৬টি।
এই ধারার ব্যতিক্রম ঘটেছে মাত্র দুবার। ১৯৯৮ সালে বিল ক্লিনটনের ডেমোক্র্যাটরা এবং ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের রিপাবলিকানরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে আসন বাড়াতে পেরেছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এই প্রবণতাকে ‘প্রেসিডেনশিয়াল পেনাল্টি’ বা ‘মিডটার্ম পেনাল্টি’ বলে থাকেন—ক্ষমতায় থাকার কারণেই ভোটাররা মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দলকে শাস্তি দেন, হোয়াইট হাউসের ওপর নজরদারি বাড়ানোর চেষ্টা হিসেবে।
১৯৪৬ সালের পর সবচেয়ে বড় ভরাডুবি হয়েছে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের আমলে। গড় হিসাবে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রায় ২৯টি হাউস আসন হারিয়েছে, যেখানে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা প্রায় ২৩।
সবচেয়ে বড় পরাজয়টি ছিল ২০১০ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ক্ষমতায় আসার দুই বছর পর ডেমোক্র্যাটরা ৬৪টি আসন হারায় এবং প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে চলে যায়। এর আগে হ্যারি ট্রুম্যানের আমলে ১৯৪৬ সালে ডেমোক্র্যাটরা হারিয়েছিল ৫৬টি আসন, আর ক্লিনটনের আমলে ১৯৯৪ সালে হারিয়েছিল ৫৪টি—দুবারই হাউসের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়।
রিপাবলিকানদের সবচেয়ে বড় পরাজয় এসেছে ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ারের আমলে ১৯৫৮ সালে ৫০টি আসন এবং জেরাল্ড ফোর্ডের আমলে ১৯৭৪ সালে ৪৮টি আসন হারিয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ২০১৮ সালে রিপাবলিকানরা ৪২টি আসন ও হাউসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল।
বড় পরাজয় মানেই সব সময় নিয়ন্ত্রণ হারানো নয়, আবার আসন কম হারিয়েও নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হতে পারে। ১৯৬৬ সালে লিন্ডন জনসনের ডেমোক্র্যাটরা ৪৭টি আসন হারিয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছিল। অন্যদিকে ২০ বছর পর রোনাল্ড রিগ্যানের রিপাবলিকানরা হাউসে মাত্র চারটি আসন হারালেও আটটি আসনের ধাক্কায় সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারায়।
১৯৪৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের সাতটিতে (১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৯৪, ২০০৬, ২০১০, ২০১৮ ও ২০২২) প্রতিনিধি পরিষদ হাতবদল হয়েছে। সিনেটে প্রেসিডেন্টের দল আসন হারিয়েছে ২০ বারের মধ্যে ১৩ বার, তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলেছে মাত্র ছয়বার—১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৮৬, ১৯৯৪, ২০০৬ ও ২০১৪ সালে।
সিনেটে চিত্রটা আলাদা হওয়ার কারণ, সেখানে প্রতিবার মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়; সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর এবং নির্বাচন ধাপে ধাপে হয়। ফলে কোন কোন রাজ্যে ভোট হচ্ছে, সেটাও জাতীয় মেজাজের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই সময়ের মধ্যে সিনেটে সবচেয়ে বড় ক্ষতি ছিল আইজেনহাওয়ারের রিপাবলিকানদের—১৯৫৮ সালে ১৩টি আসন; ট্রুম্যানের ডেমোক্র্যাটরা ১৯৪৬ সালে হারিয়েছিল ১২টি, আর ওবামার ডেমোক্র্যাটরা ২০১৪ সালে নয়টি আসন হারিয়ে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে তুলে দেয়।
কখনো কখনো দুই কক্ষ বিপরীত দিকে গেছে। ১৯৮২ সালে রিগ্যানের রিপাবলিকানরা হাউসে ২৬টি আসন হারালেও সিনেটে একটি আসন পায়। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের রিপাবলিকানরা হাউস হারালেও সিনেটে একটি আসন বাড়ায়, আর ২০২২ সালে জো বাইডেনের ডেমোক্র্যাটরা হাউস হারিয়ে সিনেটে একটি আসন বেশি পায়।
কোন কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, তার ওপরই নির্ভর করে কে কর্মসূচি ঠিক করবে এবং আইন পাস হবে কি না। কোনো বিল আইনে পরিণত হতে হলে দুই কক্ষেই পাস হয়ে প্রেসিডেন্টের সই বা ভেটোর জন্য যেতে হয়; ফলে যেকোনো এক কক্ষে বিরোধী সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা আটকে যেতে পারে। হাউসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে তদন্ত শুরু করা এমনকি প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন করাও সম্ভব, আর সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল প্রেসিডেন্টের মনোনীত প্রার্থীদের—আজীবন মেয়াদের ফেডারেল বিচারকসহ—আটকে দিতে পারে।
এবারের নির্বাচনে হাউসের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের দরকার আরও তিনটি আসন, আর সিনেটে দরকার চারটি। সিনেটে ৫০-৫০ সমতা হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নির্ণায়ক ভোটের সুবিধায় নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতেই থেকে যাবে। জরিপের ইঙ্গিত অনুযায়ী, ২০২৬ সালে প্রেসিডেন্টের দলের আসন বাড়ার সেই বিরল ঘটনা তৃতীয়বার ঘটছে না।



