বিকেলে থেমে এলো সাভার-আশুলিয়ার শ্রমিক বিক্ষোভ, সাধারণ ছুটি ২৬৪ কারখানায়

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, ব্ল্যাকলিস্টিং ও শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ সোমবার (২ নভেম্বর) বিকেলের পর অনেকটাই থেমে গেছে। দিনভর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের পর শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।
কয়েক দিন ধরে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া, গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল এবং নারায়ণগঞ্জে একই দাবিতে পোশাকশ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে আসছেন। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষও হয়েছে।
সোমবার সকাল থেকে সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় নরসিংহপুর এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সাভার-আশুলিয়ার ২৬৪টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। সংঘর্ষে শিল্প পুলিশের একজন সহকারী পুলিশ সুপার আহত হয়েছেন।
শিল্প পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, সকালে নিশ্চিন্তপুর এলাকার নিউএজ কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শুরু করেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাঁরা কারখানা থেকে বেরিয়ে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁরা আশপাশের কারখানার সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। অনন্ত গ্রুপের কারখানার সামনে জড়ো হওয়ার পর শ্রমিকেরা হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনেও অবস্থান নেন। সেখানে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের উত্তেজনা তৈরি হয়।
সকাল থেকে আশুলিয়ার নরসিংহপুর, নিশ্চিন্তপুর, জিরাবো, কাঠগড়া ও ঘোষবাগ এলাকাতেও শ্রমিকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাড়ইপাড়া এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেন। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ বাধা দিতে গেলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের ছোড়া ইটের আঘাতে শিল্প পুলিশ-১-এর সহকারী পুলিশ সুপার শোয়েব আহমেদ আহত হন।
বেলা সোয়া ১১টার দিকে নরসিংহপুরের নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে হা-মীম গ্রুপের একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। একই সময়ে বিভিন্ন কারখানার সামনে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে কর্তৃপক্ষ একের পর এক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। অনন্ত, নিট এশিয়া, আল-মুসলিম, টাউজার লাইন, হনরোল, শারমিন, ডেকো, বেঙ্গলসহ বিভিন্ন পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। জিরাবো-কাঠগড়া সড়কের বেঙ্গল প্লাস্টিক পাইপস লিমিটেডের কারখানার সামনেও শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বিকেলে জানান, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সাভার ও আশুলিয়ার ২৬৪টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক কারখানার শ্রমিকেরা কাজ না করে বেরিয়ে গেছেন। আশপাশের যেসব কারখানায় কাজ চলছিল, সেখান থেকেও শ্রমিকদের বের করে দেওয়া হয়েছে। নরসিংহপুর, বিশমাইল ও কাঠগড়া এলাকার অধিকাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আন্দোলনে বহিরাগত দুষ্কৃতকারীদের যোগ দেওয়ার তথ্যও পুলিশের কাছে রয়েছে বলে জানান তিনি।
শিল্পাঞ্চলে বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন স্থান থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে আটকের সঠিক সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন। বিকেলে শিল্পাঞ্চল পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, শিল্প পুলিশ, আশুলিয়া থানা ও সাভার থানা-পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গাড়ি ভাঙচুর, কারখানায় হামলা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় জড়িত অনেককে আটক করেছে। বিভিন্ন ইউনিট অভিযান পরিচালনা করায় গ্রেপ্তারের মোট সংখ্যা সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি; সন্ধ্যার পর তা জানানো যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিকেলে শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন শেষে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং বোর্ড কার্যক্রম শুরু করেছে। এরপরও যাঁরা শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন, তাঁদের কর্মকাণ্ডকে শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করছে না পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে এবং পেছনে থাকা ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। ইতিমধ্যে অনেক বিশৃঙ্খলাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ডিআইজি আরও বলেন, পুলিশের গুলিতে কোনো শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মহল মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপ থেকে উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। এসব গ্রুপে রাতে পরদিন নির্দিষ্ট স্থানে আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয় এবং পরদিন সেখানে আন্দোলনের ঘটনা ঘটে। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, আন্দোলনের মধ্যে হেলমেট ও মুখোশ পরা কিছু ব্যক্তি ভাঙচুর ও সহিংসতায় জড়িয়েছেন। তাঁদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ, সাংবাদিকদের ধারণ করা ভিডিও এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, শ্রমিকদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে কিছু দুষ্কৃতকারী শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, আগাম গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ায় শিল্পাঞ্চলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। কারখানাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ ও মালিকপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। শ্রমিকদের কাজে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পুলিশের।
শিল্পাঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশ, শিল্প পুলিশ, এপিবিএন ও আরআরএফ সদস্য মোতায়েন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।




