ছয় দিনের রেকর্ড যুদ্ধবিরতি শেষে খেরসনে আবার হামলা, চিকিৎসাকেন্দ্রে আঘাতের অভিযোগ

ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলে আবার লড়াই শুরু হয়েছে। ছয় দিনের যুদ্ধবিরতিতে কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো এই সম্মুখভাগের অঞ্চলে বন্দুকের শব্দ থেমেছিল। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর এটিই ছিল দীর্ঘতম যুদ্ধবিরতি।
এই যুদ্ধবিরতির সুযোগে রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় শহর ওলেশকি ও এর আশপাশে আটকে পড়া শত শত মানুষকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। শনিবার শত শত ওলেশকি বাসিন্দা উত্তর ইউক্রেনে পৌঁছালে আবেগঘন দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। বহু বছর দেখা না হওয়া স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হন অনেকে, অশ্রুসিক্ত স্বজনদের সঙ্গে দেখা হয় তাঁদের। সাংবাদিকদের কাছে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিরা ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরে বছরের পর বছর ক্ষুধা ও কষ্টের কথা বলেন।
কিন্তু সোমবার সকালে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, হামলা আবার শুরু হয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, মস্কো খেরসন শহরের কেন্দ্রে একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে আঘাত হেনেছে। এ ছাড়া একটি রুশ ড্রোন তাঁদের গাড়িতে হামলা চালালে ৬২ বছর বয়সী এক নারী ও ৭৩ বছর বয়সী এক পুরুষ আহত হন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ইউক্রেনের অভিযোগ, রুশ বাহিনী মানবিক যুদ্ধবিরতিকে নিজেদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করতে, সেনা ইউনিট বদলি করতে এবং গোলাবারুদ পৌঁছে দিতে ব্যবহার করেছে। ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ বলেছে, ‘শত্রুপক্ষ মানবিক বিরতিকে নিজেদের অবস্থান সাজাতে ব্যবহার করেছে।’ তারা রুশ ইউনিটগুলোর বদলি, সড়কগুলোতে ড্রোনবিরোধী সরঞ্জাম সম্প্রসারণ এবং গোলাবারুদ সরবরাহ রেকর্ড করেছে বলেও জানিয়েছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের বক্তব্যে এর পরোক্ষ সমর্থন মিলেছে। তিনি বলেছেন, ‘এটা ধরে নেওয়া যুক্তিসংগত যে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীও এই সময়টাকে প্রয়োজনীয় পুনর্গঠনের জন্য ব্যবহার করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি চর্চা।’
এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। কিয়েভ ও মস্কো বারবার তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছে, যদিও তাঁর সম্পৃক্ততার বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
অস্বাভাবিক এক সহযোগিতার চিত্র দেখা গেছে রাশিয়ার মানবাধিকার বিষয়ক ওম্বাডসম্যান ইয়ানা লানত্রাতোভা ও তাঁর ইউক্রেনীয় সমকক্ষ দিমিত্রো লুবিনেৎসের মধ্যে। দুজন যুদ্ধবিরতি তদারকি করেছেন, ওলেশকিতে গেছেন এবং একসঙ্গে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে তাঁদের। তাঁরা প্রকাশ্যে একে অপরকে তাঁদের কাজের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং বারবার তুলে ধরেছেন, যুদ্ধবিরতির কোনো লঙ্ঘন পরিলক্ষিত হয়নি।
লানত্রাতোভা ও লুবিনেৎস দুজনেই উদ্যোগটি অন্যত্রও পুনরাবৃত্তির আহ্বান জানিয়েছেন, এবং ইউক্রেন বারবার বলেছে, জাতীয় পর্যায়েও এ ধরনের যুদ্ধবিরতি পালনে তারা প্রস্তুত থাকবে। লানত্রাতোভা বলেছেন, যাঁরা থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই শত শত বাসিন্দা প্রতি মাসে মানবিক সহায়তার চালান পাবেন; এই সিদ্ধান্তও মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতার ফল।
কিন্তু ক্রেমলিন দ্রুতই এমন পুনরাবৃত্তির ধারণা উড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধবিরতি চলার সময়েই ক্রেমলিন ওলেশকিকে ‘একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে অভিহিত করে, যা ‘নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া’—অর্থাৎ স্থবির শান্তি আলোচনাকে—প্রভাবিত করবে না। পেসকভ সোমবার আবারও বলেছেন, ‘এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা বা উদ্যোগ নেই।’
গত সপ্তাহে খেরসন অঞ্চলে বন্দুক থামলেও ইউক্রেনের অন্যত্র রাশিয়ার বিমান হামলা অব্যাহত ছিল, যাতে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়। ফলে ওলেশকি ও এর আশপাশে অস্বাভাবিকভাবে বিস্তৃত ও তুলনামূলক দীর্ঘ যুদ্ধবিরতি পালনের সিদ্ধান্ত ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম।
খেরসনে আবার গোলাগুলি শুরু হওয়ার পর ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার চারটি অঞ্চলের কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। সামারায় বাসিন্দারা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা এবং আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী ওঠার কথা জানিয়েছেন; সেখানে এক মাসে পঞ্চমবারের মতো একটি তেল শোধনাগারে আঘাত হানা হয়।
সেনা বদলি ও পুনঃসরবরাহের তৎপরতা দেখিয়েছে, কোনো পক্ষই ওলেশকিকে ভবিষ্যতে টেকসই স্বস্তির নমুনা হিসেবে আশা করছে না। যুদ্ধবিরতি ওলেশকির জন্য বিরল এক স্বস্তির মুহূর্ত এনে দিলেও, যুদ্ধের বৃহত্তর গতিপথে তা তেমন কোনো পরিবর্তন আনেনি; যুদ্ধ এখনো চলছে।




