সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য সরকারের জরুরি নির্দেশনা: করণীয় ও বর্জনীয়ের পূর্ণ তালিকা

সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে জরুরি নির্দেশনা প্রকাশ করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সোমবার মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এসব নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের সৌদি আরবের আইন, সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতি মেনে চলার পাশাপাশি বৈধভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভিসা ও চুক্তি যাচাইয়ের বিষয়ে বলা হয়েছে, যাওয়ার আগে ভিসা, নিয়োগকর্তা ও নিয়োগচুক্তি ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। বিএমইটি ছাড়পত্র, প্রশিক্ষণ ও মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিজের কাছে রাখতে হবে এবং দালালের মৌখিক আশ্বাসে টাকা দেওয়া যাবে না। ভিজিট ভিসায় কাজ করা যাবে না, অনুমতি ছাড়া অন্য নিয়োগকর্তার অধীনেও কাজ করা যাবে না।
ইকামা সব সময় সঙ্গে রাখতে এবং Absher-এ এর মেয়াদ নিয়মিত যাচাই করতে বলা হয়েছে। QIWA প্ল্যাটফর্মে নিয়োগচুক্তি ও ওয়ার্ক পারমিট যাচাই করতে হবে। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ছয় মাস আগে নবায়ন বা রিইস্যুর উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
না বুঝে কোনো কাগজে স্বাক্ষর বা টিপসই দেওয়া যাবে না এবং OTP ও পাসওয়ার্ড কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। নিয়োগচুক্তির কপি ও কাজসংক্রান্ত প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে; বেতন ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে ব্যাংক স্টেটমেন্ট সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কোনো সমস্যা হলে মকতব আমলের ১৯৯১১ নম্বরে অথবা বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ হলে কর্মস্থল থেকে পালিয়ে না গিয়ে আইনগতভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে QIWA প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। দেশে ফেরার আগে জরিমানা ও ট্রাভেল ব্যান আছে কি না যাচাই করতে হবে; Final Exit ভিসার নির্ধারিত মেয়াদ অতিক্রম করা যাবে না এবং অনুমোদন পাওয়ার আগে নতুন কাজে যোগ দেওয়া যাবে না।
অন্যের টাকা, সোনা বা মোবাইল পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বহন করা যাবে না। বড় অঙ্কের নগদ অর্থ বা সোনা বহনের ক্ষেত্রে কাস্টমসের নিয়ম মেনে চলতে হবে।
সৌদি আরবের আইন ও সামাজিক রীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে: জনসমক্ষে শালীন পোশাক ও ভদ্র আচরণ, লাইনে দাঁড়ানো এবং বয়স্কদের সম্মান করা। রাস্তায় ময়লা, থুতু বা পানের পিক ফেলা, প্রকাশ্যে ঝগড়া, গালাগালি ও মারামারি থেকে বিরত থাকতে হবে। জাতি, দেশ বা গায়ের রং নিয়ে কাউকে কটূক্তিও করা যাবে না।
নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে যথাযথ দূরত্ব ও শালীনতা বজায় রাখতে হবে এবং অনুমতি ছাড়া ছবি, ভিডিও বা স্পর্শ থেকে বিরত থাকতে হবে। রমজানে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে খাওয়া ও ধূমপান থেকে বিরত থাকা, মসজিদে মোবাইল ফোন নীরব রাখা এবং ধর্ম, রাজপরিবার বা সরকার নিয়ে মন্তব্য বা পোস্ট না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মিছিল, সমাবেশ ও ধর্মঘটে অংশ নেওয়া যাবে না।
অনলাইন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো খবর শেয়ার করার আগে তা যাচাই করতে বলা হয়েছে। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও দুই ধাপের নিরাপত্তা ব্যবহার এবং শুধু অফিসিয়াল অ্যাপ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গুজব, অশ্লীল ভিডিও বা মিম ফরোয়ার্ড করা যাবে না; ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, আঘাতস্থল বা নিরাপত্তা-সংবেদনশীল স্থানের ছবি ও ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ বা শেয়ার করাও যাবে না।
গাড়ি চালাতে হলে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির বিমা নিশ্চিত করতে হবে; সিটবেল্ট ব্যবহার, গতিসীমা ও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না এবং দুর্ঘটনা ঘটলে ঘটনাস্থল ছেড়ে যাওয়া যাবে না। দুর্ঘটনায় জরুরি সহায়তার জন্য ৯১১ বা ৯৯৯ নম্বরে এবং অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ৯৯৭ নম্বরে ফোন করতে বলা হয়েছে। প্রাণঝুঁকি না থাকলে আহত ব্যক্তিকে অপ্রয়োজনে সরানো যাবে না এবং দুর্ঘটনাস্থলে ভিড় বা ছবি-ভিডিও করা যাবে না।
টাকা পাঠাতে হবে শুধু ব্যাংক ও অনুমোদিত এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে; হুন্ডিতে টাকা পাঠানো যাবে না। নিজের সিম, কার্ড বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অন্যকে ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না এবং অন্যের ঋণের জামিনদার হওয়া যাবে না।
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ওষুধ নিতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে প্রেসক্রিপশন ও মূল প্যাকেট সঙ্গে রাখতে হবে; অন্যের দেওয়া প্যাকেট, ব্যাগ বা ওষুধ বহন করা যাবে না। মদ, জুয়া ও মাদক থেকে দূরে থাকতে হবে। গরমের সময় পর্যাপ্ত পানি পান ও ছায়ায় বিশ্রাম নিতে হবে, কর্মক্ষেত্রে হেলমেট ও সেফটি বেল্টসহ সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হবে। ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সরাসরি রোদে কাজ না করার নির্দেশনা রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
হজ, উমরাহ ও জিয়ারাহ করতে হবে নুসুক অ্যাপের মাধ্যমে অনুমতি নিয়ে; অনুমতি ছাড়া হজ বা হাজি বহন করা যাবে না। বিয়ে আইনসম্মতভাবে নিবন্ধন এবং সন্তানের জন্মনিবন্ধন করতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে সৌদি কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তা নিতে বলা হয়েছে; পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়ানো যাবে না এবং সমস্যা সমাধানের নামে দালালকে টাকা দেওয়া যাবে না।
বিজ্ঞপ্তিতে সৌদি প্রবাসীদের বৈধভাবে অবস্থান, দেশটির আইন মেনে চলা এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বিপদে একা সিদ্ধান্ত না নিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


