মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনে বিদেশ থেকে অর্থায়নের অভিযোগ পুলিশের, নাম এল ইলিয়াস-কচি-জাহাঙ্গীরের
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুরে নাশকতার পরিকল্পনা ও অর্থায়নের অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম বিদেশে বসে এই অর্থের জোগান ও নির্দেশনা দিচ্ছেন।
পুলিশের দাবি, ঢাকায় তাদের হয়ে লোক সংগ্রহ ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন ইলিয়াস মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ এবং জাহাঙ্গীরের সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েল। গত রোববার মিরপুর এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ থেকে গ্রেপ্তার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ২৬ নেতাকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের মোবাইল ফোন যাচাই করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিছিলে অংশ নিলে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা, টায়ারে আগুন দিলে ৩ হাজার টাকা এবং গাড়ি বা কোনো স্থাপনায় আগুন দিলে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কোথাও কোথাও গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের জন্য ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার তথ্যও পেয়েছেন কর্মকর্তারা। কাজের প্রমাণ হিসেবে ছবি বা ভিডিও পাঠানো ছিল টাকা পাওয়ার অন্যতম শর্ত; কয়েকজন গ্রেপ্তার ব্যক্তি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পেয়েছেন বলেও দাবি গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি)।
ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শ্রমিকের ছদ্মবেশে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিক্ষোভে অংশ নিতে বলা হয়েছিল। আত্মগোপনে থাকা বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের নির্দেশনায় নাশকতার জন্য লোকজন জড়ো করা হয় বলে তাদের ভাষ্য।
পুলিশের তথ্যে এসএম মান্নান কচি তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি। অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারীর পদ হারিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। ২০২৫ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তারা আত্মগোপনে থাকায় এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ডিবির হাতে গ্রেপ্তার ১১ জন হলেন মাহবুবুর রহমান জুয়েল (৩৮), মো. কামাল গাজী (৩২), মো. ওলীউল্লাহ অনিক (২০), আলিফ হোসেন ইমন (২৬), মো. নাহিদ হাসান (১৮), আরিফ আকন্দ (২৯), মো. রমজান সরকার (১৮), মোয়াজ্জেম শাহরিয়ার ওরফে নিয়াজ (২৬), জুবায়ের ইসলাম জিসান (২২), আরিফ (১৮) ও মাহিম মোল্লা (১৮)। ডিবি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারদের কেউ রংমিস্ত্রি, কেউ রিকশাচালক, কেউ রিকশার গ্যারেজে কাজ করেন, কেউ ফুটপাথের দোকানি। তাদের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন অ্যাপে ভিন্ন ভিন্ন নামে ২০ থেকে ২৫টি গ্রুপের সন্ধান পেয়েছেন গোয়েন্দারা; এসব গ্রুপে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে নিজেদের অবস্থান ও তৎপরতার তথ্য দিতেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, জুয়েল ও কামাল গাজী গত রোববার মিরপুর ১২ নম্বর এলাকা থেকে ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হন। এছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শুভ এবং মিরপুরের রূপনগর আওয়ামী লীগের সদস্য কামাল গাজীর নামও পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনে বিদেশে পলাতক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও ছবি পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি গোয়েন্দাদের। ইলিয়াস মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লাকে ধরতে বেশ কয়েক জায়গায় অভিযান চালিয়েছে ডিবি, তবে তাকে পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিবির মিরপুর বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনে যোগ দিয়ে নাশকতার উদ্দেশ্যে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ জন নেতাকর্মীকে জড়ো করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কক্সবাজার, নোয়াখালী ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী রয়েছেন। ওই কর্মকর্তা জানান, এসব ব্যক্তি সাধারণ শ্রমিকের ছদ্মবেশে মিরপুর ২, ১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন; পরে অনলাইন গ্রুপের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো হয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে যান।
পুলিশের দাবি, গত রোববার মিরপুর ১০ নম্বরে শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে অনলাইন গ্রুপে বার্তা পাঠান আলিফ মোল্লা; তিনি নেতাকর্মীদের মিরপুর ২ নম্বরের লাভ রোডে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেন। পরে সেখান থেকে তাদের মিরপুর ১১ নম্বর মেট্রো স্টেশনের নিচে পাঠানো হয়। পুলিশ সংঘর্ষ সামাল দিতে ব্যস্ত থাকার সুযোগে মেট্রো স্টেশনের নিচে থাকা পুলিশের একটি গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়; পরে সেই ঘটনার ছবি ও ভিডিও আলিফের কাছে পাঠানো হয় বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের সময় পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে রাজিব চন্দ্র দাস নামে এক তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার রাতে রাজধানীর উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ; পরে তাকে পল্লবী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশ জানায়, রাজিব প্যারাগন গ্রুপের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন এবং শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলা ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
গত রোববার মিরপুর ১১ নম্বরে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ থেকে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় মিরপুরের তিন থানায় চারটি মামলা করেছে পুলিশ; মামলাগুলোতে অন্তত ১০ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশের ওপর হামলা, ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ এবং সরকারি গাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে মামলাগুলোতে।
এসব মামলায় দুই দিনে থানা পুলিশ ও ডিবি অন্তত ৫০ জন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে গত রোববার গ্রেপ্তার হওয়া ২৬ জনকে সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়; তাদের তিনটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। শুনানি শেষে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। গ্রেপ্তার ২৬ জনের মধ্যে পল্লবী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় ১৩ জন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় করা আরেকটি মামলায় ৭ জন এবং মিরপুর মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় ৬ জন রয়েছেন।
এদিকে একই দাবিতে তৃতীয় দিনের মতো সোমবারও মিরপুরে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন শ্রমিকরা। তবে তাদের সড়কে নামতে বাধা দেয় পুলিশ; দুই দফায় আন্দোলনকারীরা সড়কে নামার চেষ্টা করলে ধাওয়া দিয়ে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার আবু নাসের রিকাবদার বলেন, পুরো বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে; যাচাই-বাছাই করে আরও কয়েকটি মামলার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম ও প্রিভেনশন উত্তর) মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে দুষ্কৃতকারীরা রয়েছে; যারা আইন অমান্য করছে বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে, তারা পুলিশের দৃষ্টিতে অপরাধী এবং তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
শ্রমিকদের সামনে রেখে নাশকতাকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। সোমবার সচিবালয়ে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।




