‘অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের আন্দোলনকারী মানছে না পুলিশ’, আশুলিয়ায় ডিআইজির হুঁশিয়ারি

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং বোর্ড ইতিমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে। এরপরও যারা শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে, তাদের শ্রমিক আন্দোলনকারী হিসেবে বিবেচনা করছে না পুলিশ। এসব ব্যক্তি ও তাদের পেছনে ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোমবার বিকালে শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি পরিদর্শনকালে ঢাকার সাভারের আশুলিয়া-বাইপাইল সড়কের জামগড়া এলাকায় একটি কারখানার সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন।
ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আপনারা জানেন, গতকাল (রবিবার) সকালে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। মজুরি বোর্ড ইতিমধ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। সরকার আইনিভাবে শ্রমিকদের মজুরির বিষয়টি দেখছে। এরপরও যারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে, তাদের কর্মকাণ্ডকে আমরা শ্রমিক আন্দোলন বলে মনে করি না। তারা শ্রমিক নয়, বরং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শ্রমিকদের নির্বিঘ্নে কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ শ্রমিকদের পাশে রয়েছে। মালিকদেরও কারখানা স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি। কারখানার নিরাপত্তার দায়িত্ব পুলিশ পালন করছে বলেও জানান ডিআইজি।
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের পাশাপাশি পেছন থেকে ইন্ধনদাতাদের সম্পর্কেও পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে উল্লেখ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ‘কেউ আইনের বাইরে নন। যে যতটুকু বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবেন, তার বিরুদ্ধে ততটাই কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা হবে। ইতিমধ্যে অনেক বিশৃঙ্খলাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারা কতটুকু জড়িত, তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানা ও স্থানে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এসব ঘটনায় মামলা দায়ের, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন ডিআইজি।
পুলিশের গুলিতে এক শ্রমিকের মৃত্যুর গুজব প্রসঙ্গে ডিআইজি বলেন, গত দুই দিন ধরে সাংবাদিকেরা সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন স্থানে সংবাদ সংগ্রহ করছেন, তাদের প্রতিনিধিরাও মাঠে রয়েছেন। কোথাও পুলিশের গুলিতে কোনো শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে গুজব ছড়ানোর কারখানা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি কুচক্রী মহল রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে পোশাকশ্রমিকদের ব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে; এর মাধ্যমে শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে ডিআইজি বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ শান্ত রয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে যারা ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা করছে, তারা শ্রমিক নয়; তারা দুষ্কৃতকারী ও ষড়যন্ত্রকারী, যারা পোশাকশিল্প ও বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করতে চায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। শ্রমিক নেতা কিংবা অন্য কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উসকানি দিয়ে অথবা আর্থিক মদত দিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন।
ডিআইজি বলেন, কিছু জায়গায় স্কুল-কলেজ খোলা থাকা অবস্থায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। আজ বিকেএসপি স্কুল খোলা থাকাকালে এক শিক্ষার্থী দৌড়ে নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলে আহত হয়েছেন; ঘটনাটি নিজ চোখে দেখেছেন বলে জানান তিনি। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি নির্দিষ্ট গ্রুপ থেকে উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়ানোর বিষয়টি গত চার দিন ধরে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানান মোস্তাফিজুর রহমান। তার দাবি, এসব গ্রুপে রাতে পরদিন নির্দিষ্ট স্থানে আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে এবং পরদিন সেখানেই আন্দোলনের ঘটনা ঘটছে। গুজব ও উসকানি ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যাপক সদস্য মোতায়েনের কথা জানিয়ে ডিআইজি বলেন, শ্রমিকরা সকালে কারখানায় প্রবেশের পর ধীরে ধীরে কর্মবিরতি পালন করেন; পরে কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলে তারা রাস্তায় নেমে আন্দোলন শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডিআইজি, এসপি ও জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা মাঠে রয়েছেন। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকের পুলিশ, এপিবিএন ও এসআরবি সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, বিভিন্ন স্থানে বিশৃঙ্খলাকারীদের আটক করেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ, আশুলিয়া থানা ও সাভার থানা-পুলিশ। তবে আটকের সঠিক সংখ্যা এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, যারা গাড়ি ভাঙচুরের চেষ্টা করেছে, পোশাক কারখানায় হামলা চালিয়েছে, শ্রমিকদের আহত করার চেষ্টা করেছে এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে, তাদের অনেককেই আটক করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে; এখনও পুলিশের সদস্যরা মাঠে রয়েছেন এবং সন্ধ্যার পর সব তথ্য সমন্বয় করে গ্রেপ্তারের মোট সংখ্যা জানানো সম্ভব হবে।




