ইয়াবাসহ আত্মসমর্পণ করে সাজা খাটা জিহাদই এখন টেকনাফ সদর ইউনিয়নের প্রশাসক, বিতর্ক তুঙ্গে
কক্সবাজারের টেকনাফে ইয়াবাসহ আত্মসমর্পণ করে কারাদণ্ড ভোগ করা জিয়াউর রহমান জিহাদকে মেয়াদোত্তীর্ণ টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের ইউপি-১ শাখা। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর টেকনাফজুড়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ১০২ জন ইয়াবা কারবারি ৩০টি দেশীয় অস্ত্র ও সাড়ে ৩ লাখ ইয়াবাসহ পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাদেরই একজন জিয়াউর রহমান জিহাদ। আত্মসমর্পণকারীরা পরে দেড় বছরের সাজা ভোগ করেন।
গত ২৭ অক্টোবর জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব আতিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জিহাদকে প্রশাসক ও ৯ জনকে সদস্য মনোনীত করে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ১২০ দিনের জন্য পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদনের পাঁচ দিন পর, ৩ নভেম্বর জিহাদ ও অন্য সদস্যরা পরিষদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন বলে জানা গেছে।
২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক মোহাম্মদ ইসমাঈল জিহাদসহ ১০১ জন আত্মসমর্পণকারীকে দেড় বছরের কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জিহাদ টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের গুদারবিল এলাকার বাসিন্দা, মৃত আলী আহমেদের ছেলে।
জিহাদের বিরুদ্ধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য (কক্সবাজার-৪) আব্দুর রহমান বদির সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ২০ আগস্ট চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার হয়ে বদি কারাগারে রয়েছেন। আওয়ামী লীগ আমলে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রক হিসেবে বদি ‘ইয়াবা গডফাদার’ কুখ্যাতি পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বদির স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন আক্তারের নির্বাচনী প্রচারণায় জিহাদের অংশ নেওয়ার বেশ কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দা জানান, বদির সঙ্গে সখ্যতাকে কাজে লাগিয়ে ২০২১ সালে নিজের দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন টেকনাফ উপজেলা বিএনপির সদস্য জিয়াউর রহমান জিহাদ। কক্সবাজার জেলা বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক হাসান সিদ্দিকী জানান, ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী শাহীন আক্তারের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ায় জিহাদকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, তবে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেকনাফ উপজেলা বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, দল এখন ক্ষমতায়; যারা ১৭ বছর ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে আঁতাত করেছে, তারা এখনো সুসময়ে এসে সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে। জিহাদ বদিঘনিষ্ঠ — এটি দিনের আলোর মতো সত্য; তাকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া দুঃখজনক। রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক কাউকে এই দায়িত্ব দেওয়া যেত, যেভাবে অনেক পরিষদে দেওয়া হয়েছে।
নবগঠিত পরিষদে সদস্য হিসেবে ১ নম্বর ওয়ার্ডে রশিদ মিয়া, ২ নম্বর ওয়ার্ডে রানু আক্তার, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে শাহ আলম, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে লায়লা বেগম, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে জহির আহমদ, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে মৌলবী রফিক, ৭ নম্বর ওয়ার্ডে রশিদ আলম, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে রেদুয়ান এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডে নজির আহমদ দায়িত্ব পেয়েছেন।
এই সদস্যদের মধ্যে ছয়জনই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের সবারই পদ-পদবি রয়েছে। ১ নম্বর ওয়ার্ডের রশিদ মিয়া টেকনাফ সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শাহ আলম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং ৪ নম্বর ওয়ার্ডের লায়লা বেগম টেকনাফ উপজেলা মহিলা লীগের প্রচার সম্পাদক ছিলেন। ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মৌলভী রফিক উপজেলা আওয়ামী ওলামা লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের রশিদ আলম একই সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নজির আহমদ উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য। অন্যদিকে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রেদুয়ানও আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারি এবং জিহাদের সঙ্গে কারাভোগ করেছেন।
প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া প্রসঙ্গে জিয়াউর রহমান জিহাদ বলেন, ‘আমি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে এই পরিষদ গত ৫ বছর সামলেছি। এটি সাময়িক দায়িত্ব এবং নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত জনগণের সেবা দিয়ে যাব।’ আত্মসমর্পণ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘১৭ বছর সবাই নির্যাতিত ছিল, আমিও পরিস্থিতির শিকার হয়েছি।’
ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রশাসকের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, সেখানে ব্যক্তির নাম থাকে; তাই কে সরকারি কর্মকর্তা আর কে রাজনৈতিক দলের নেতা, সেটা জানার সুযোগ থাকে না। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান জানান, ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা আদালতের রায় থাকলে সেটি নিয়োগের যোগ্যতায় কী প্রভাব ফেলে, তা আইনগতভাবে যাচাইয়ের বিষয় এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথি পর্যালোচনা করা হবে।



