৯ নভেম্বর তুরস্কের আনাতোলিয়ায় বসছে কপ ৩১ জলবায়ু সম্মেলন, এবার গুরুত্ব বাস্তবায়নে
জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন, কপ ৩১, অনুষ্ঠিত হবে ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনাতোলিয়ায়। সম্মেলনে তুরস্ক সভাপতিত্ব করবে আর অস্ট্রেলিয়া আনুষ্ঠানিক আলোচনার নেতৃত্ব দেবে। এবারের সম্মেলনের বিশেষ তাৎপর্য হলো, নতুন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দেওয়ার ঘোষণা।
তিন দশকের জলবায়ু সম্মেলনের মঞ্চে প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতির পাহাড় ক্রমেই উঁচু হয়েছে। কিন্তু কার্বন নিঃসরণ, জলবায়ু অর্থায়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সুরক্ষায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি কতটা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি ইতিমধ্যে উদ্বেগজনক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয় ১৯৯২ সালের রিও ধরিত্রী সম্মেলনে গৃহীত জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কাঠামো সনদের মাধ্যমে। এর মূল দর্শন ছিল, জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক সমস্যা হলেও সব দেশের ঐতিহাসিক দায় ও সক্ষমতা সমান নয়। ১৯৯৫ সালে প্রথম কপ অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে নিয়মিত আন্তর্জাতিক আলোচনা শুরু হয়।
১৯৯৭ সালের কিয়োটো প্রটোকল উন্নত দেশগুলোর জন্য নির্গমন হ্রাসের বাধ্যতামূলক লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও সীমিত অংশগ্রহণ ও বাস্তবায়নগত দুর্বলতার কারণে বৈশ্বিক নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে তা যথেষ্ট কার্যকর হয়নি।
২০০৯ সালের কোপেনহেগেন সম্মেলনে উন্নত দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বছরে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন সংগ্রহের লক্ষ্য ঘোষণা করে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য পূরণ হয়নি। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) হিসাব মতে, ২০২২ সালে প্রথমবার তা অতিক্রম করে অর্থায়ন ১১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এই বিলম্ব জলবায়ু আলোচনায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে আস্থার সংকটকে আরও দৃশ্যমান করে।
২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি জলবায়ু কূটনীতিতে ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করে। এতে শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে রাখা এবং ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে সীমিত রাখার প্রচেষ্টা চালানোর লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। দেশগুলো পাঁচ বছর অন্তর নিজেদের জাতীয় নির্ধারিত অবদান বা এনডিসি আরও উচ্চাভিলাষী করার অঙ্গীকার করে।
২০২১ সালের গ্লাসগো কপ ২৬-এ প্রথমবারের মতো সম্মিলিত সিদ্ধান্তে নিয়ন্ত্রণহীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ধাপে ধাপে কমানো এবং অদক্ষ জীবাশ্ম জ্বালানি ভর্তুকি হ্রাসের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও অর্থায়ন জোরদারের প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। তবে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সম্পূর্ণ সরে আসার বিষয়ে বাধ্যতামূলক সময়সূচি নির্ধারিত হয়নি।
২০২২ সালে মিসরের শারম আল-শেখে কপ ২৭ একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করে। দীর্ঘ আলোচনার পর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষয়ক্ষতি তহবিল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশসহ জলবায়ুঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এটি ছিল জলবায়ু ন্যায্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
২০২৩ সালের দুবাই কপ ২৮-এ প্রথম বৈশ্বিক অগ্রগতি মূল্যায়ন বা গ্লোবাল স্টকটেক সম্পন্ন হয়। সম্মেলনে জ্বালানিব্যবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ন্যায়সংগত ও সুশৃঙ্খল উত্তরণের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা তিন গুণ এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির বার্ষিক হার দ্বিগুণ করার লক্ষ্য সামনে আসে। ক্ষয়ক্ষতি তহবিল কার্যকর করার সিদ্ধান্তও ছিল গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে এসব সিদ্ধান্তের বড় সীমাবদ্ধতা ছিল বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব।
২০২৪ সালে আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত কপ ২৯ মূলত জলবায়ু অর্থায়নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উৎস মিলিয়ে বছরে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থায়ন সম্প্রসারণের বৃহত্তর লক্ষ্য সামনে আনা হয়।
যদিও আগের ১০০ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি, অনেক উন্নয়নশীল দেশ একে বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত মনে করে। কারণ, জলবায়ু অভিযোজন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রয়োজন বিপুল বিনিয়োগ। এখানে অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি অর্থায়নের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। ঋণনির্ভর সহায়তা জলবায়ুঝুঁকিপূর্ণ দেশের ঋণের বোঝা বাড়াতে পারে। তাই অনুদান, স্বল্প সুদের অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সহজলভ্য তহবিলকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত হয়েছিল কপ ৩০। তার পর এবার আনাতোলিয়ার সম্মেলনে প্রশ্ন হলো, প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের ব্যবধান কতটা কমবে।

