মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ তদন্তের তালিকা ডেমোক্র্যাটদের

মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে থাকায় নতুন কংগ্রেসে বড় কোনো আইন পাস হয়ে প্রেসিডেন্টের সই পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করা হচ্ছে। এর বদলে কংগ্রেসে তদারকি ও তদন্তের দিকেই বেশি জোর দেবেন ডেমোক্র্যাটরা।
ভোটারদের কাছে সরকারি দুর্নীতি ও ব্যর্থ নেতৃত্ব ছিল প্রধান দুটি উদ্বেগের বিষয়। হাউস ও সিনেটে ক্ষমতায় ফিরে ডেমোক্র্যাটরা তদন্তের উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি নিয়েছেন। নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁদের হাতে কংগ্রেসের পূর্ণ তদন্ত ক্ষমতা তুলে দিয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে নথি তলব (সাবপোয়েনা) করার এবং ব্যক্তিদের আইনপ্রণেতাদের সামনে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করার ক্ষমতা।
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া হাউস ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক বিবৃতিতে তিনি সংক্ষেপে বলেছেন, ‘আইনজীবী নিয়োগ করুন’ (লইয়ার আপ)।
ডেমোক্র্যাটদের প্রধান তদন্ত লক্ষ্যের একটি হলো মৃত দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা ও সংযোগ। দ্বিদলীয় কংগ্রেসনাল পদক্ষেপের চাপে ট্রাম্প প্রশাসন এপস্টেইনের অপরাধ ও অন্যান্য অভিযুক্ত অপরাধের ফেডারেল তদন্তসংক্রান্ত বিস্তৃত নথি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছিল। তবে ডেমোক্র্যাটদের দাবি, অনেক নথি অযথাযথভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে বা জনসমক্ষে আনা হয়নি। বিচার বিভাগ ট্রাম্পকে ক্ষতিকর অভিযোগ থেকে রক্ষা করতে কাজ করেছে বলেও তাঁরা বলেন—যা বিভাগের নেতৃত্ব অস্বীকার করেছে।
নতুন কংগ্রেসে আইনপ্রণেতারা এপস্টেইনের সঙ্গে প্রেসিডেন্টসহ অন্যান্য ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সম্পর্ক খতিয়ে দেখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটদের ভাষ্য, এপস্টেইনের অপরাধের শিকারদের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার অংশ এটি।
অক্টোবরের এক প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে হাউস জুডিশিয়ারি কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট মেরিল্যান্ডের প্রতিনিধি জেমি রাসকিন বলেন, ট্রাম্প বলেছেন তিনি এপস্টেইনকে চিনতেন ‘পাম বিচে সবাই যেভাবে চিনত, ঠিক সেভাবেই’—কিন্তু ঠিক তা নয়। ১১ জন নারীর বিষয়ে প্রমাণ তাঁদের সম্পর্ক এবং তাঁদের নেটওয়ার্কে তরুণী ও মেয়েদের ওপর নির্যাতনের ভিন্ন ও অনেক বেশি নিন্দনীয় চিত্র তুলে ধরে বলে রাসকিন বলেন। প্রেসিডেন্ট দীর্ঘদিন ধরে এপস্টেইনসংক্রান্ত কোনো অন্যায়ের কথা অস্বীকার করে আসছেন।
ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট, তাঁর পরিবার, নিজেদের ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের আর্থিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগের তদন্তও চালিয়ে যাবেন। বিশেষ করে তাঁরা প্রেসিডেন্টের চলমান ব্যবসায়িক স্বার্থের দিকে ইঙ্গিত করেছেন—যার মধ্যে রয়েছে ট্রুথ সোশ্যাল, কয়েকটি ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রকল্প এবং তাঁর ছেলেদের ও প্রভাবশালী বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জড়িত বিদেশি প্রকল্প।
গার্সিয়া গত মাসে এমএস নাউতে লেখা এক মতামত নিবন্ধে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের সঙ্গে উভয় দলের রাজনীতিকদের নিজ স্বার্থে কাজ করার সম্পর্ক টেনেছেন। তিনি লিখেছেন, রাজনৈতিক ব্যবস্থাজুড়ে লাখ লাখ ডলারের অন্ধকার অর্থ প্রবাহিত হচ্ছে, কংগ্রেসের কিছু সদস্য হয়তো জনগণের অজানা তথ্যের ভিত্তিতে শেয়ার কেনাবেচা করছেন এবং সরকার ও বড় করপোরেশনের লবিংয়ের মধ্যে ঘূর্ণায়মান দরজা ঘুরতেই থাকছে। আমেরিকানরা জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটে ভুগছেন এবং ক্ষমতার এই অপব্যবহার তা আরও বাড়াচ্ছে, অথচ দেশের সবচেয়ে ধনীরা আগের চেয়ে আরও ধনী হচ্ছেন বলে তিনি লিখেছেন।
ট্রাম্প কঠোর অভিবাসন নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন। কিন্তু এ বছর মিনেসোটায় দুই মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুসহ ফেডারেল অভিবাসন কর্মীদের জড়িত কয়েকটি আলোচিত ঘটনার পর তাঁর বহিষ্কার কর্মসূচির প্রতি জনসমর্থন তলানিতে ঠেকেছে। সংখ্যালঘু থাকাকালে ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসন কর্মীদের বিরুদ্ধে কথিত নির্যাতন ও অনিয়মের শত শত ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন এবং নতুন মেয়াদেও সেই কাজ চালিয়ে যাবেন। প্রথম দুই বছরে কংগ্রেসনাল তদারকি ছাড়াই থেকে যাওয়া সহিংসতার ঘটনাগুলো নিয়ে শুনানি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অক্টোবরে টেক্সাসের অস্টিনে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই) কর্মীদের গুলির ঘটনা নিয়ে মাঠপর্যায়ের শুনানি করেছেন ডেমোক্র্যাটরা। শুনানির পর ওয়াশিংটনের প্রতিনিধি প্রমীলা জয়াপাল বলেন, আইসিই একটি আইনবহির্ভূত, বেপরোয়া সংস্থা যা সারা দেশের কমিউনিটিতে প্রজন্মজুড়ে মানসিক আঘাত সৃষ্টি করছে, এবং হাউস ডেমোক্র্যাটরা সেই তদারকির কাজ করছেন যা রিপাবলিকানরা করতে অস্বীকার করছেন।
জুনে ডেমোক্র্যাটরা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ট্রাম্প প্রশাসন কীভাবে জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো ও দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাণঘাতী রোগ নিয়ে মার্কিন বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে দুর্বল করেছে বলে তাঁরা মনে করেন, তা তুলে ধরেন। নতুন বছরেও সেই কাজ চলবে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও মানবসেবা মন্ত্রী রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়রের ওপর নজর রেখে।
রিপাবলিকান কংগ্রেসনাল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সময় ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতার বলিষ্ঠ ব্যবহার অনিয়ন্ত্রিত ছিল; তা বদলাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কমিটির কর্মীদের ইঙ্গিত, হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইং সংস্কার, স্মারক খিলান নির্মাণ, লিংকন মেমোরিয়াল রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কার, জন এফ. কেনেডি সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টস বন্ধ করা এবং হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেন বাঁধানোসহ প্রেসিডেন্টের পছন্দের প্রকল্পগুলো কঠোর কংগ্রেসনাল তদারকির মুখে পড়বে। এসব প্রকল্প বরাদ্দ প্রক্রিয়া নিয়ে বৃহত্তর সাংবিধানিক লড়াইয়ের সঙ্গে জড়িত—করদাতার অর্থ কীভাবে খরচ হবে তা নির্ধারণের একক কর্তৃত্ব কংগ্রেসের, আর হোয়াইট হাউস বারবার তার ঘোষণা উপেক্ষা করে কংগ্রেস অনুমোদিত কোটি কোটি ডলারের ব্যয় বাতিল করেছে।
মার্কিন-ইরান যুদ্ধ নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের তদারকিতেও কংগ্রেসের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব কেন্দ্রে থাকবে। যুদ্ধ ঘোষণার একক কর্তৃত্ব আইনসভার, এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারের জন্য প্রেসিডেন্টদের অনুমোদন নিতে হয়—যা এই মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে ঘটেনি। ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধের খরচ নিয়েও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ পেন্টাগন কর্মকর্তাদের চাপ দেবেন। ডেমোক্র্যাটরা দায়িত্ব নেওয়ার আগেই লেম-ডাক অধিবেশনে হেগসেথের বিরুদ্ধে হাউসে অভিশংসন ভোট হতে পারে। যুদ্ধ ক্ষমতা নিয়ে আরও ভোটও প্রত্যাশিত—প্রেসিডেন্টকে সংঘাত শেষ করতে বাধ্য করার প্রচেষ্টা, যার কয়েকটিতে সীমিত দ্বিদলীয় সমর্থন মিলেছে; আগের ভোটগুলো পাস হলেও সেগুলো মূলত প্রতীকী এবং আইনের ভার বহন করে না।
প্রযুক্তি জায়ান্ট ইলন মাস্ক রিপাবলিকান রাজনীতিতে কোটি কোটি ডলার ঢেলেছেন, কিন্তু তাঁর স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবায় বিঘ্ন রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সামরিক অভিযান ব্যাহত করার পর তিনি ডেমোক্র্যাটদের রোষের মুখে পড়েছেন। সিলিকন ভ্যালির হাউস ডেমোক্র্যাটদের একটি দল অক্টোবরে হোয়াইট হাউসে লেখা চিঠিতে বলেছে, ১২০তম কংগ্রেস মাস্কের ব্যবসাগুলোকে দেওয়া ফেডারেল তহবিল নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখবে—প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তির বাধ্যবাধকতা পূরণ করছে কি না এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ইচ্ছামতো সেবা সীমিতকরণ ও ফেডারেল সম্পদের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সুরক্ষা আছে কি না তা দেখা হবে।



