ঋণমুক্তি ও সাহায্য দাসত্বের ক্ষতিপূরণের বিকল্প নয়, যুক্তরাজ্যকে বললেন ক্যারিবীয় নেতারা

যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে ঋণমুক্তি ও উন্নয়ন সহায়তার প্রস্তাব শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা দাসত্বের ক্ষতিপূরণের বিকল্প হতে পারে না বলে জানিয়েছেন ক্যারিবীয় ক্ষতিপূরণ-ন্যায় আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা।
তাঁদের এই মন্তব্য এসেছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের শুক্রবারের ঘোষণার পর। ওই ঘোষণায় বার্নহ্যাম বলেছিলেন, তিনি দাসত্ব ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে একটি কাঠামোবদ্ধ সংলাপ শুরু করতে চান এবং ব্রিটেনের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে তিনি উন্মুক্ত, তবে ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব তিনি নাকচ করেছেন।
এর বদলে তিনি ছোট কমনওয়েলথ দেশগুলোর জন্য ঋণ পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন এবং আগামী তিন বছরে ক্যারিবীয় অঞ্চলের জরুরি অবকাঠামোর জন্য ৪ কোটি পাউন্ড (৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার) সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন।
৫৬ সদস্যের কমনওয়েলথ ব্লকের নেতারা অ্যান্টিগায় তাঁদের শীর্ষ সম্মেলনের একটি গোপন অবকাশ বৈঠকে মিলিত হওয়ার সময়ে সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডাইনসের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষতিপূরণ-ন্যায় আন্দোলনের ‘রিপেয়ার ক্যাম্পেইন’-এর জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব রালফ গনসালভেস বলেন, অঞ্চলের দেশগুলো বার্নহ্যামের প্রস্তাবকে স্বাগত জানাতে পারে, তবে ঋণ পুনর্গঠন বা উন্নয়ন সহায়তাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিবেচনার যেকোনো চেষ্টা ক্যারিবীয় অঞ্চল প্রতিহত করবে।
ক্যারিবীয় সম্প্রদায়ের (ক্যারিকম) ক্ষতিপূরণ কমিশনের তৈরি ১০ দফা পরিকল্পনায় অঞ্চলটির ক্ষতিপূরণ-ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে ‘ঋণ বাতিল’ চাওয়া হয়েছে—ঋণ পুনর্গঠন নয়—এবং ‘আর্থিক ক্ষতিপূরণ’ দাবি করা হয়েছে। পরিকল্পনাটির যুক্তি হলো, সাবেক উপনিবেশগুলোর বর্তমান ঋণ প্রজন্মান্তরে বয়ে চলেছে এবং শেষ পর্যন্ত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা ঔপনিবেশিক শোষণের সঙ্গে তা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
গনসালভেস বলেন, ‘আমি যখন অ্যান্ডি বার্নহ্যামের কথা শুনলাম, আর রাজার কথা শুনলাম, তাঁরা বলছেন ক্ষতিপূরণ নয়, বরং ঋণমুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের অবকাঠামোর মতো নির্দিষ্ট বিষয়ে কাজ করাই সহায়ক হবে। এখন, এসব বিষয়ই ১০ দফা পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এগুলো ২০১৫ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) মধ্যেও রয়েছে, যেখানে আমরা সবাই জাতিসংঘে স্বাক্ষর করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ক্ষতিপূরণ-ন্যায়ের ১০ দফা পরিকল্পনায় পরিবেশ, মানসিক নিরাময়ের মতো বিষয় রয়েছে এবং রাস্তাফারি ধর্মের সদস্য কিংবা যেসব ভাই-বোন আফ্রিকার দেশগুলোতে ফিরে যেতে চান, তাঁদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে মিলে ঠিক করতে হবে। তবে এর আর্থিক দিক রয়েছে, তাই ১০ দফা পরিকল্পনার ভিত্তিতে একটি আলাদা বরাদ্দ রাখতে হবে।
শ্রমিক দলের এমপি বেল রিবেইরো-অ্যাডি আফ্রিকান ক্ষতিপূরণবিষয়ক সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপের সভাপতি। মঙ্গলবার একটি বৈশ্বিক ক্ষতিপূরণ কাফেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, প্রশ্নটি মূলত ‘নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার’ (এজেন্সি) নিয়ে। এই কাফেলা বিভিন্ন দেশে ঘুরে মানুষকে ক্ষতিপূরণ আন্দোলন সম্পর্কে জানাবে ও যুক্ত করবে।
রিবেইরো-অ্যাডি বলেন, ‘ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়ের ব্যবস্থা যখন করা হবে, তা অবশ্যই যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাঁদের সঙ্গে মিলেই করতে হবে। কারণ, যদি তা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা ক্ষতিপূরণ নয়। সেটা কী, আমি জানি না, কিন্তু তা ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায় নয়।’ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের দাস বানানোর সময় তাঁদের কাছ থেকে যে জিনিসটি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তা হলো তাঁদের নিজের জীবনের সবকিছু সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার, বলেন তিনি।
গনসালভেস বলেন, ক্ষতিপূরণ-ন্যায়কে উন্নয়ন সহায়তায় নামিয়ে আনার বিপদ হলো, এমন সহায়তা যুক্তরাজ্যের বিবেচনার ওপরই থেকে যায়। তাঁর ভাষায়, আলোচনাকে কেবল টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের কাঠামোর মধ্যে রাখা হচ্ছে, অথচ ক্ষতিপূরণ-ন্যায়ের সুনির্দিষ্ট দিকগুলো আলাদাভাবে বুঝতে হবে।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব কমনওয়েলথ স্টাডিজের পরিচালক ও মানবাধিকার আইনজীবী অধ্যাপক কিংসলে অ্যাবটও ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়গুলোর ক্ষতিপূরণের ধরন নির্ধারণে নির্ণায়ক ভূমিকা থাকার ওপর জোর দেন। মঙ্গলবার বৈশ্বিক ক্ষতিপূরণ কাফেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নৃশংস অপরাধের শিকার মানুষেরা গুয়াতেমালা, কলম্বিয়া, নেপাল বা মিয়ানমার—যেখানকারই হোন না কেন, তাঁরা সবাই ন্যায় চেয়েছেন এবং নিজেদের আবার পূর্ণ করে তোলা হোক, তা চেয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নতুন যুগে কমনওয়েলথের প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে গড়তে আরও শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি করতে চান। তাঁর ভাষায়, অতীতের মুখোমুখি একসঙ্গে হয়ে এবং এমন ভবিষ্যতের দিকে মনোযোগ দিয়ে তা করা হবে, যেখানে কমনওয়েলথের প্রতিটি মানুষের সমতা, নিরাপত্তা ও আশা থাকবে। বৈশ্বিক ঋণ সমস্যা মোকাবিলায় বেসরকারি অর্থায়নের ভূমিকা, জলবায়ু সংকট মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তাসহ বিশ্বের নানা বিষয়ে কমনওয়েলথ অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও মুখপাত্র জানান।




