ঢাকায় গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে অধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবিতে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম, ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধের ঘোষণা

রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্সের (সাবেক হোম ইকোনমিক্স কলেজ, অর্থাৎ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ) শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের পদত্যাগ এবং শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার বিচার—এই দুই দফা দাবি জানিয়েছেন।
দাবি পূরণে শিক্ষার্থীরা ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল ৮টা থেকে কলেজের সামনে আবারও অবস্থান কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
শিক্ষার্থীদের প্রথম দাবি, অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেসাকে পদত্যাগ করতে হবে। পদত্যাগের লিখিত ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত কলেজের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখতে হবে এবং অধ্যক্ষকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না।
দ্বিতীয় দাবিতে রয়েছে, মধ্যরাতে কলেজ ও ছাত্রীদের আবাসিক হলে পুলিশের প্রবেশ, লাঠিচার্জ ও হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিচার। এ বিষয়ে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তের অগ্রগতি জানাতে হবে বলেও দাবি করেছেন তারা।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে কার্যালয়ে তালা দিয়ে অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করেন তারা।
রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ সেখানে গিয়ে প্রায় ১৩ ঘণ্টা পর অধ্যক্ষকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। এরপরও কলেজের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন শতাধিক শিক্ষার্থী। রাত আড়াইটা পর্যন্ত তাদের সড়কে অবস্থান করতে দেখা যায়।
অধ্যক্ষকে উদ্ধারে পুলিশের অভিযানের সময় শিক্ষার্থীদের চুল ধরে টেনে সিঁড়ি দিয়ে নামানো, লাঠিচার্জ ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, পুলিশের হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন।
আহতদের মধ্যে তিন থেকে চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একজন ছাত্রী পুলিশের পায়ের নিচে চাপা পড়ে আহত হয়েছেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এ ছাড়া কলেজের আবাসিক হলে ঢুকে পুলিশ ছাত্রীদের মারধর ও লাঠিচার্জ করেছে বলেও অভিযোগ করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের কয়েকজনের মোবাইল ফোন ও পরিচয়পত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। দুই শিক্ষার্থীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না জানিয়ে তাদের আটক করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, তাদের আন্দোলনের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বিষয় জড়িত নয়। অধ্যক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণের প্রতিবাদেই তারা আন্দোলনে নেমেছেন। তাদের সহপাঠীদের কয়েকজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পূজার ছুটির আগে কলেজের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত একটি বিদায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। তিনটি আবাসিক হলের পাঁচ বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য প্রথমে রাত ১০টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। পরে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে সময় বাড়িয়ে রাত ১২টা করা হয়। তবে অনুষ্ঠান শেষ হতে ভোর ৫টা বেজে যায়।
নির্ধারিত সময়ের পরও অডিটোরিয়াম ব্যবহার করায় অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক হলের আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেসা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরে ওই দুই শিক্ষার্থী ক্ষমা চাইতে গেলে আসন ফিরিয়ে দেওয়ার শর্ত হিসেবে এক রাতের অডিটোরিয়ামের এসি ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা দাবি করা হয়।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ অধ্যাপক মেহেরুন্নেসা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, রাত ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা ভোর ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান চালিয়েছেন। এ কারণে দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে তারা ক্ষমা চাইলে তিনি নমনীয় হন। তবে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিদ্যুৎ অপচয়ের বিল আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অধ্যক্ষ বলেন, “শিক্ষার্থীরা যা বলছে, তা টোটালি ঘটনার বিপরীত। আমি ওদের একটা অনুষ্ঠান করার অনুমতি দিয়েছিলাম রাত ১২টা পর্যন্ত। ওরা ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান করেছে। অনুষ্ঠান করার প্রেক্ষিতে আমি একটু রেগে গিয়ে ওদের দুইজনের আসন বাতিল করে দিয়েছি।”
পদত্যাগের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তারা সাদা কাগজে আমাকে পদত্যাগের স্বাক্ষর করতে বলছে। আমি কেন তাদের কাছে পদত্যাগ করবো?”
শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে কলেজের সামনে আবারও অবস্থান কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তবে চাকরির নির্ধারিত পরীক্ষা দিতে আসা পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষা চলতে দিতে চান তারা। একই সঙ্গে পরীক্ষা চলাকালে অধ্যক্ষ যাতে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পারেন, সেই দাবিও জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘জেগেছে রে জেগেছে, হোম ইকোনমিক্স জেগেছে’, ‘ক্যাম্পাসে পুলিশ কেন, জবাব চাই’ এবং ‘আমার বোন আহত কেন, জবাব চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।



