মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ে অস্ট্রেলিয়ার সামনেও একই সতর্কবার্তা, বলছেন বিশ্লেষকরা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেছে, আর তার ঢেউ পৌঁছেছে অস্ট্রেলিয়াতেও। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ফল অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জোটকে আরও বিস্তৃত করতে পারে, যদিও ওয়াশিংটনে নতুন ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরি হওয়ায় অকাস চুক্তি, ডেটা সেন্টার উন্নয়ন ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব পড়বে।
অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রিসভার সদস্য, কূটনীতিক ও প্রতিরক্ষা শিল্পখাত গভীরভাবে এই সপ্তাহের ফল পর্যবেক্ষণ করেছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শেষ দুই বছরের মেয়াদের সম্ভাবনা বড় ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয়, বিশেষ করে জ্বালানির দাম নিয়ে জনরোষ এবং ডেটা সেন্টারের প্রভাব—এই দুটি বিষয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলে বড় ভূমিকা রেখেছে, আর দুটিই অস্ট্রেলিয়ার সরকারের জন্য সতর্কবার্তা বহন করে।
ইউনাইটেড স্টেটস স্টাডিজ সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ব্রুস উলপে বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে ভোটারদের উত্তেজিত করার ট্রাম্পের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কায় প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উলপে বলেন, ‘আমার মনে হয় অনেকেই ভাবছেন, এই (অস্ট্রেলিয়ার) সরকার কী করছে? তারা কি অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে?’ তিনি বলেন, জানুয়ারিতে ইরান যুদ্ধের আগে পরিস্থিতি বেশ ভালো দেখাচ্ছিল, কিন্তু বাজেট প্রক্রিয়া ও যুদ্ধের পর মানুষ এখন শেষটা কোথায় হবে তা নিয়ে অনিশ্চিত। তাঁর ভাষায়, ‘এটি তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানযোগ্য সমস্যা নয়, এবং মানুষ এটা সত্যিই অপছন্দ করে।’
ওয়েস্টপ্যাকের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির প্রধান এলিয়ট ক্লার্ক বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভূমিধস ফল ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য গতিপথ ‘নাটকীয়ভাবে বদলে’ দিয়েছে, যা অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, ‘এটি মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের চারপাশের আবহ বদলে দিয়েছে। এটি ইতিবাচক খবর।’
নির্বাচনের ফল আসতে শুরু করলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম তীব্রভাবে কমে যায়। এপ্রিলের সর্বোচ্চ দাম ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকা ব্রেন্ট ক্রুডের দাম উল্টো ২০ শতাংশ পড়ে গেছে। ক্লার্কের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সমাধানের সম্ভাবনায় আস্থা বাড়লে মূল্যস্ফীতি কমাতে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদহার বাড়ানো থেকে বিরত রাখতে সাহায্য হবে।
জোটের ফ্রন্টবেঞ্চার অ্যান্ড্রু হেস্টি বলেন, এই ফল দেখিয়েছে অর্থনৈতিক বার্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ২জিবি রেডিওকে বলেন, ‘শুল্ক ও ইরান যুদ্ধের পর মানুষ নিজেদের অবস্থা আরও খারাপ মনে করছে, আর ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েকবার বলেছেন তিনি আসলেই পাত্তা দেন না।’
ওয়াশিংটনে সাবেক রাষ্ট্রদূত আর্থার সিনোডিনোস বলেন, ক্যাপিটল হিলের এই বদল অস্ট্রেলিয়ার কর্মকর্তাদের জন্য দুই মার্কিন দলের সঙ্গেই নীতিগত লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ, এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরের সম্পর্ক নিয়েও ভাবার সুযোগ। তাঁর মতে, কংগ্রেস ইউক্রেনকে সমর্থন ও গোলাবারুদ তহবিলের ব্যবস্থা পাসে প্রশাসনের ওপর আরও চাপ দিতে পারে। চীন আরও আত্মবিশ্বাসী বোধ করলেও তাইওয়ান নিয়ে হঠাৎ কোনো পদক্ষেপে তা রূপ নেবে না বলেও তিনি মনে করেন।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ব্যালটে ছিলেন না বলেই রিপাবলিকানরা খারাপ করেছে, যদিও তিনি বারবার ভোটারদের তিনি ব্যালটে আছেন মনে করে ভোট দিতে বলেছিলেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধকেই ‘স্পষ্ট অপরাধী’ বলে অভিহিত করেছেন।
সাবেক শিল্পমন্ত্রী এড হুসিক জোটের আমূল পুনর্গঠন চান। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের মুহূর্ত এখনই। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কংগ্রেস সেই প্রশাসনকে ভিন্নভাবে কাজ করতে বাধ্য করবে, যার মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার মতো মিত্রদের শুল্ক দিয়ে ক্ষতি না করাও রয়েছে।’
এশিয়া গ্রুপের অংশীদার ও বাইডেন প্রশাসনের সময় অকাস চুক্তির অন্যতম রূপকার আবে ডেনমার্ক অস্ট্রেলিয়ার জন্য এই ফলকে অতিরঞ্জিত করে না দেখতে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, বদলাবে ওয়াশিংটনে ক্ষমতার বণ্টন—ডেমোক্র্যাট চেয়াররা অনুমোদন ও বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ করবেন, রিপাবলিকানরা দলীয় লাইন ভাঙতে আরও আগ্রহী হবেন, আর দুই দলের ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রার্থীরা আলাদা করে নজরে আসতে চাইবেন। ডেনমার্ক বলেন, অকাস ব্যয় নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের চেয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিতে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিন শিল্পভিত্তির উৎপাদনে বড় ধরনের গতি আনা দরকার।
ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ইতিমধ্যে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থগিতাদেশের আহ্বান জানিয়েছেন। গ্রিনস সিনেটর সারা হ্যানসন-ইয়ং বলেন, টেক্সাস, জর্জিয়া ও ওহাইওর মতো ডেটা সেন্টার-কেন্দ্রিক এলাকাগুলো ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকেছে, এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী রিচার্ড মার্লস বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় ও ডেটা সেন্টার নিয়ে উদ্বেগ দুই দেশেই কাজ করছে; ডেটা সেন্টার কোথায় বসবে সে বিষয়ে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ঠিক রাখা জরুরি, আবাসিক এলাকায় এগুলো বসানো উচিত নয় এবং সঠিক বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।


