এলপিজির দাম দুই মাসে বেড়েছে ৪৭৫ টাকা, রাজধানীর মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে কমে গেছে খাবারের পদ

একসময় শুক্রবারের দুপুরে খাবারের টেবিলে মাছ, মাংস, ডাল, সবজি আর ভর্তাসহ সব মিলিয়ে পাঁচ-ছয় পদের আয়োজন থাকত রাজধানীর মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে। এখন সেই পরিবারগুলোতেই রান্না হচ্ছে এক থেকে দুই পদ। কোনো দিন মাছের সঙ্গে শুধু ডাল, কোনো দিন ডিমের ঝোল কিংবা আলুভর্তা দিয়েই সারতে হচ্ছে দুপুর ও রাতের খাবার। বিকেলের নাশতা, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা সপ্তাহান্তের বাড়তি আয়োজনও কমেছে।
বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রান্নার জ্বালানি এলপিজির খরচ। ফলে সংসারের আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে অনেক। এতে মাসের হিসাব মেলাতে মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে কমছে খাবারের পদের সংখ্যা, বদলে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেট, রায়েরবাজার ও জিগাতলা এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে রান্নাঘরের এমন পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যায়। এসব এলাকার কয়েকটি মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিণীরা জানিয়েছেন, আগে প্রতিদিনের খাবারে দুই থেকে চার পদের আয়োজন থাকলেও এখন খরচ কমাতে এক বা দুই পদেই সীমাবদ্ধ থাকতে হচ্ছে। মাছ-মাংস রান্নার দিন কমেছে, অনেক ক্ষেত্রে একবার রান্না করেই দুই বেলা চালানো হচ্ছে। এমনকি শিশুদের নাশতা ও পরিবারের সদস্যদের পছন্দের খাবার তৈরিতেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সর্বশেষ মূল্য সমন্বয় অনুযায়ী, চলতি বছরের ২ নভেম্বর থেকে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা। এর আগে ৪ অক্টোবর দাম ছিল ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ২২৩ টাকা। সেপ্টেম্বর মাসে নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। সব মিলিয়ে দুই মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা।
এদিকে সরকারি নির্ধারিত দামেও সব জায়গায় সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহ সংকট ও বাড়তি দামের কারণে অনেক ক্রেতাকে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ফলে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে কোথাও কোথাও ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। এতে মাসে একটি সিলিন্ডার ব্যবহার করা পরিবারগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ভাড়া বাসায় থাকেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী মো. রাসেল আহমেদ। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তাঁদের চার সদস্যের সংসার। তিনি বলেন, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়ালেখা, চিকিৎসা ও বাজার খরচ মেটানোর পর মাস শেষে খুব একটা টাকা হাতে থাকে না। আগে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন মাছ ও মাংস রান্না হতো, শুক্রবারে থাকত বাড়তি আয়োজন। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। তিনি বলেন, আয় আগের মতোই আছে, অথচ প্রতিটি খাতে খরচ বেড়েছে; সিলিন্ডার কিনতেই এখন বাড়তি টাকা রাখতে হচ্ছে, ফলে খাবারের পেছনে ব্যয় কমানো ছাড়া আর তেমন কোনো উপায় থাকছে না।
মোহাম্মদপুরের টাউন হল মার্কেটে স্বামীর সঙ্গে বাজার করতে আসা নাদিয়া আক্তার শারমিন জানান, আগে মাছ বা মাংস রান্নার পাশাপাশি ডাল, সবজি ও ভর্তাও তৈরি করতেন। এখন একসঙ্গে এত পদ রান্না করেন না। মাছ রান্না হলে সেদিন সবজি বাদ যায়, মাংস রান্না হলে ডাল বা অন্য পদ বাদ রাখতে হয়। কখনো আগের দিনের তরকারি দিয়েই পরের বেলার খাবার সারতে হচ্ছে। বিকেলের নাশতার আয়োজনও কমেছে, কারণ বেশি পদ করলে মাস শেষ হওয়ার আগে গ্যাস শেষ হয়ে যায়।
রায়েরবাজার এলাকার গৃহিণী সাবনিরা আক্তার বলেন, আগে মাছ, মাংস, ডিম ও সবজি মিলিয়ে খাবারে বৈচিত্র্য রাখার চেষ্টা করতেন। এখন মাংস রান্না হয় বিশেষ কোনো দিন বা সপ্তাহান্তে। মাছের পরিমাণও কমেছে। ডিম, আলুভর্তা, ডাল ও মৌসুমি সবজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। গ্যাস সাশ্রয়ের জন্য একবারে বেশি রান্না করে রাখার চেষ্টা করেন তিনি। তিনি বলেন, সন্তানদের খাবারের পুষ্টি ও পছন্দের বিষয়টি মাথায় রাখতে হয়; সবকিছুর দাম বাড়ায় প্রতিদিন পছন্দমতো খাবার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না তাদের, এবং মাসের শেষ দিকে রান্নার তালিকা আরও ছোট হয়ে আসে।
জিগাতলার বাসিন্দা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জাফর মোল্লা বলেন, স্ত্রী, এক সন্তান ও বৃদ্ধ মা নিয়ে তাঁর চার সদস্যের সংসার; ব্যবসার আয় প্রতিদিন এক রকম থাকে না। আগে বাজার থেকে মাছ, মুরগি ও সবজি কিনে কয়েক দিনের খাবারের পরিকল্পনা করতেন তাঁর স্ত্রী, এখন বাজারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী রুবাইয়া বেগম বলেন, এখন কোনো দিন শুধু ডাল ও সবজি, কোনো দিন ডিমের ঝোল বা মাছের পাতলা তরকারি দিয়েই খাবার শেষ করতে হয়। মাংস রান্না হলে পরিমাণ কিছুটা বাড়তি রাখা হয়, যাতে দুই বেলা চালানো যায়। অতিথি এলে আগে যে বাড়তি পদ রান্না করা হতো, এখন তা সম্ভব হয় না।
জিগাতলায় মেসে থেকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন রাফি। এই শিক্ষার্থী বলেন, তাঁরা চারজন একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকেন এবং বুয়ার মাধ্যমে খাবার রান্না হয়। বাসা থেকে যে টাকা দেওয়া হয় তা দিয়েই চলতে হয়। গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম বাড়ায় তাঁদের ওপর বিশাল চাপ পড়ছে।
এলপিজির বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে সিলিন্ডার বিক্রির বাজারেও। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বিক্রেতারা বলছেন, দাম বাড়ার পর ক্রেতারা আগের মতো সহজে সিলিন্ডার কিনছেন না। নিউমার্কেট এলাকার এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রেতা নাজিম উদ্দিন বলেন, আগে যে পরিমাণ সিলিন্ডার বিক্রি হতো, এখন তা হচ্ছে না; ক্রেতারা দাম শুনে অনেক সময় কেনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছেন, কেউ কেউ বাকিতে সিলিন্ডার দেওয়ার অনুরোধ করছেন। একই বাজারের আরেক বিক্রেতা মিজানুর রহমান বলেন, ক্রেতারা আগের তুলনায় বেশি হিসাব করে কিনছেন; কেউ একবারে সিলিন্ডার না কিনে কয়েক দিন অপেক্ষা করছেন, কেউ আবার কম খরচে রান্নার জন্য বৈদ্যুতিক চুলা বা বিকল্প ব্যবস্থার খোঁজ করছেন, যদিও সব পরিবারের পক্ষে বিকল্প চুলা কেনা বা ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাংলাদেশের এলপিজি বাজারের প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতনির্ভর। দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন, যার প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালি রান্নার কাজে। ফলে এলপিজির দাম ও সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হলে সরাসরি প্রভাব পড়ে বিপুলসংখ্যক পরিবারের ওপর। তিনি বলেন, এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়, এটি মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসেও প্রভাব ফেলছে; সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য কয়েকশ টাকা বাড়তি ব্যয়ও বড় চাপ তৈরি করছে, আর সেই চাপ সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে রান্নার পদের সংখ্যা কমানোসহ খাবারের তালিকায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে।


