মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টার ঘিরে কঠোর নিয়মের ঢেউ, জরিপে তিন-চতুর্থাংশ ভোটারই নিজের এলাকায় নতুন কেন্দ্রের বিরোধী

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ডেটা সেন্টার নির্মাণ ঘিরে কঠোর নিয়ম আসার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাটদের অনেকে এই বিদ্যুৎ-খেকো বিশাল স্থাপনাগুলোর ওপর লাগাম টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আর ভোটারদের জরিপেও দেখা গেছে, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মার্কিন ভোটার নিজের এলাকায় নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধী।
এপি ও একদল সংবাদমাধ্যমের জন্য করা ভোটার জরিপে ৫৬ শতাংশ ভোটার বলেছেন, ডেটা সেন্টার ছিল তাঁদের ভোটের ক্ষেত্রে ‘গুরুত্বপূর্ণ বা প্রধান’ বিবেচনা, আর ৭৬ শতাংশ বলেছেন, নিজের এলাকায় নতুন ডেটা সেন্টার হলে তাঁরা তার বিরোধিতা করবেন। এই বিরূপ মনোভাব যাঁরা এবার ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি জোরালো ছিল।
তবে জরিপে ইস্যুটির অবস্থান ছিল আরও বড় দুটি ইস্যুর পেছনে। ভোটারদের ৯০ শতাংশ সরকারি দুর্নীতিকে এবং ৮৯ শতাংশ জীবনযাত্রার ব্যয়কে ‘গুরুত্বপূর্ণ বা প্রধান’ বিবেচনা বলেছেন। এপির ভোটার জরিপের আরেকটি হিসাব অনুযায়ী, প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভোটার ডেটা সেন্টারকে কংগ্রেসের ভোটের ক্ষেত্রে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলেছেন, যা দুর্নীতি বা জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম।
পিউ রিসার্চের সাম্প্রতিক জরিপেও একই ধরনের চিত্র এসেছে। ওই জরিপ অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক মার্কিন মনে করেন, ডেটা সেন্টার পরিবেশ, বাড়ির জ্বালানি খরচ ও জীবনযাত্রার মানের জন্য ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খারাপ’—জানুয়ারির পর থেকে এই মনোভাবের দ্রুত অবনতি হয়েছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনের প্রচারেও ইস্যুটি ছিল বড়। অ্যাডইমপ্যাক্টের তথ্য অনুযায়ী, বড়-ছোট মিলিয়ে বিভিন্ন প্রচারে ডেটা সেন্টারের উল্লেখ থাকা টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে ব্যয় হয়েছে ৩৮ কোটি ডলারের বেশি, আর এই বিষয়ে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের তুলনায় তিন গুণের বেশি ব্যয় করেছে। ডেটা সেন্টার নিয়ন্ত্রণ নিজে বেশিরভাগ জায়গায় সরাসরি ব্যালটে না থাকলেও, কঠোর অবস্থান অনেক প্রার্থীর প্রচারের অংশ ছিল।
ডেমোক্র্যাটরা টেক্সাস, ওহাইও, জর্জিয়া, নেভাদা ও আইওয়াসহ অন্তত পাঁচটি রাজ্যের গভর্নরের দপ্তলে দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রণ ভেঙেছেন; এর অনেকগুলোই ডেটা সেন্টারের বড় কেন্দ্র। দলটি উইসকনসিন, মিনেসোটা, পেনসিলভানিয়া, নেভাদা ও মিশিগানে রাজ্য সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও পেয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো নির্মাণের বড় তিন রাজ্য টেক্সাস, জর্জিয়া ও ওহাইও—তিনটিতেই ডেমোক্র্যাট সিনেটর ও গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন, যাঁরা কোনো না কোনোভাবে ডেটা সেন্টারে কঠোর নিয়মের ডাক দিয়েছেন।
ডেটা সেন্টার ওয়াচ নামের প্রকল্পটি কংগ্রেস ও গভর্নর পদে জয়ী প্রার্থীদের অবস্থান বিশ্লেষণ করেছে। এআই নিরাপত্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টেনএ ল্যাবসের এই প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, জয়ী গভর্নরদের মধ্যে, যেসব আসনে এপি বিজয়ী ঘোষণা করেছে, ৩৪ জনের মধ্যে ৩২ জনই কঠোর নিয়ম বা বিধিনিষেধ সমর্থন করেন, আর ১২ জন নিষেধাজ্ঞা বা স্থগিতাদেশ সমর্থন করেন।
টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট ক্লেটন টাকার ১৯৮৬ সালের পর প্রথম ডেমোক্র্যাট হিসেবে রাজ্যের কৃষি কমিশনার নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বলেছেন, ডেটা সেন্টার উন্নয়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতিই তাঁর জয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল; তিনি যেখানেই গেছেন, খামারিরা বলেছেন, কমতে থাকা পানির সরবরাহের জন্য ডেটা সেন্টার অস্তিত্বের হুমকি। টাকার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন, ‘এখানে একটা পুরোনো কথা আছে—হুইস্কি পানের জন্য, আর পানি লড়াইয়ের জন্য। ঠিক সেটাই ঘটেছে।’
উইসকনসিনের নবনির্বাচিত গভর্নর ডেভিড ক্রাউলি প্রচারের সময় প্রতিপক্ষের চাপে অবস্থান বদলে কঠোর লাইনে গেছেন। শুরুতে স্থগিতাদেশের বিরোধী থাকলেও পরে তিনি তা সমর্থন করেন এবং ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী ও নির্মাতাদের জন্য রাজ্যের বিক্রয়কর ছাড় বাতিলের কথাও বলেন। বৃহস্পতিবার এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর কী প্রস্তাব দেবেন, তা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে; এর মধ্যে রয়েছে নির্মাতাদের পানি ও জ্বালানি ব্যবহার সম্পর্কে আরও তথ্য প্রকাশ, প্রকল্প এগোনোর আগে এলাকার সমর্থন নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি খরচ থেকে সাধারণ গ্রাহক ও করদাতাদের রক্ষা করা।
রাজ্যগুলোর মধ্যে টেক্সাসের ফলকে ডেটা সেন্টারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেছে মরগান স্ট্যানলি। সেখানে ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসা গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন; তিনি বলেছেন, টেক্সাসবাসীর জন্য ভালো চুক্তি না হলে বা বাসিন্দাদের মতামত না নেওয়া হলে তিনি ডেটা সেন্টারের অনুমতি আটকে দেবেন। তিনি রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়েছেন, যিনি আগে টেক্সাসকে ‘এআই উন্নয়নের কেন্দ্র’ বললেও প্রচারের শেষ দিকে লাগাম টানার চেষ্টা করেছিলেন। ওহাইওতে ডেমোক্র্যাট ডা. অ্যামি অ্যাক্টন গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন; নির্দিষ্ট মান পূরণ না হলে প্রকল্প আটকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি, যা নিয়ে মরগান স্ট্যানলি ওই রাজ্যে প্রকল্প বিলম্বের বড় ঝুঁকি দেখছে।
সংখ্যার দিক থেকেও এই তিন রাজ্য এগিয়ে। ডেমোক্র্যাটদের দখলে যাওয়া সিনেট আসনগুলোর মধ্যে টেক্সাসে ডেটা সেন্টার ৫৯৫টি, ওহাইওতে ২৫৮টি ও আইওয়াতে ১১৭টি—যেখানে ৫০টি রাজ্যের মধ্যমান ৫৫টি। শুধু টেক্সাসেই চলমান ডেটা সেন্টার নির্মাণ প্রকল্প ৩১টি, যা যেকোনো রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান জেএলএলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে টেক্সাস উত্তর ভার্জিনিয়াকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডেটা সেন্টার বাজারে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে।
বিবিসি ভেরিফাই সতর্ক করেছে, এই তথ্য থেকে সরাসরি বলা যায় না কত ভোট বা কত সিনেট আসন ডেটা সেন্টারবিরোধিতা এনে দিয়েছে। রাজ্যভিত্তিক ভোটার জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকে যাওয়া রাজ্যগুলো হয় জাতীয় প্রবণতা অনুসরণ করেছে, নয়তো ডেটা সেন্টার নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম উদ্বিগ্ন ছিল; এসব রাজ্যেও অন্যান্য বিষয় ভোটারদের প্রভাবিত করেছে।
অর্থনীতিতে এই খাতের ওজনও বড়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আইটি যন্ত্রপাতি বাদে ডেটা সেন্টার নির্মাণে মূল্যস্ফীতি-সমন্বিত মাসিক ব্যয় ২০২৬ সালের আগস্টে ছিল ৫০০ কোটি ডলার, যা ২০২৩ সালের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি। কলাম্বিয়া বিজনেস স্কুলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এআই অবকাঠামো বিনিয়োগ এখন সামগ্রিক অর্থনীতির অংশ হিসেবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে রেলপথ নির্মাণের স্বর্ণযুগের ব্যয়ের চেয়েও বড়।
ফলাফলের প্রতিক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার ওপেনএআই ডেটা সেন্টার এলাকার জনগোষ্ঠীর প্রতি নতুন অঙ্গীকারের একটি কাঠামো প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তারা ফেডারেল, রাজ্য ও স্থানীয় নীতিনির্ধারকদের কাছে এই শিল্প কীভাবে গড়ে উঠবে, তার স্পষ্ট নিয়ম লিখতে বলছে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, টেক্সাসে একটি ডেটা সেন্টার ও ওহাইওতে নির্মাণাধীন প্রকল্প থাকা ওপেনএআই নিজের বিদ্যুতের পুরো খরচ নিজেই দেওয়ার অঙ্গীকারও করেছে। শিল্প সংগঠন ডেটা সেন্টার কোয়ালিশনের কর্মকর্তা ড্যান ডায়োরিও বলেছেন, অনেক বিজয়ী স্থগিতাদেশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং তাঁরা তা পূরণ করতে চাইবেন বলেই ধরে নিতে হবে, তবে এর বাস্তব পরিণতিও থাকবে—যেমন এলাকাগুলো কর রাজস্ব বা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অর্থ থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
বৃহস্পতিবার প্রযুক্তি শেয়ারের সূচক নাসডাক তার সর্বকালের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ১১ শতাংশ নিচে নেমে গেছে; ডেটা সেন্টার নির্মাণ ধীর হয়ে যেতে পারে এবং ঋণের খরচ বাড়ছে—এমন উদ্বেগের মধ্যে এই পতন ঘটেছে। মরগান স্ট্যানলি বিশ্লেষক প্রতিবেদনে বলেছে, ডেমোক্র্যাটদের সুস্পষ্ট ফলাফলে ডেটা সেন্টারে বিধিনিষেধের প্রত্যাশা বেড়েছে, যা নতুন রাজ্য নিয়মের ফলে দেশকে নতুন ডেটা সেন্টারের জন্য উন্মুক্ত ও অনুন্মুক্ত এলাকায় ভাগ করে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, নিয়ম কঠোর হলেও নির্মাণ থামবে না। ইউরেশিয়া গ্রুপের হিদার ওয়েস্ট বলেছেন, সাময়িক নিষেধাজ্ঞা ও নতুন নিয়ম চালু হওয়া বিলম্বিত করতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি থামাতে পারবে না; ইতোমধ্যে অনুমতি পাওয়া বা নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলো মূলত এগিয়ে যাবে, বিলম্বের চাপ পড়বে পরের ধাপের নির্মাণে। ফিউচার অব টেক ইনস্টিটিউটের কোরি ক্রাইডার বলেছেন, শিল্পটিকে ধরে নিতে হবে নতুন রাজ্য নেতারা শর্ত আরোপ করবেন, এমনকি ‘মাত্রাতিরিক্ত ডেটা সেন্টার নির্মাণ’ থামিয়েও দিতে পারেন। প্রিন্সিপাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সীমা শাহ বলেছেন, বিদ্যুৎ গ্রিডে অতিরিক্ত বিনিয়োগের খরচ নির্মাতাদের বহন, পানির মতো সম্পদ ব্যবহারে কঠোর মান, কিংবা কর ছাড় ছেড়ে দেওয়ার শর্তে নির্মাণ খরচ বাড়তে ও নতুন সরবরাহ ধীর হতে পারে। অন্যদিকে অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের বিশ্লেষকরা বলেছেন, কর রাজস্ব ও নির্মাণকাজের চাকরির কারণে নির্মাণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, এমন নীতি এড়াতে রাজনীতিকদের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রণোদনাও রয়েছে।




