মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলের পর এআই কড়াকড়ির শঙ্কায় এশিয়ার বাজারে প্রযুক্তি শেয়ারে বড় ধস
যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হওয়া প্রযুক্তি শেয়ারের ধস শুক্রবার এশিয়ার বাজারেও অব্যাহত থাকলো। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে কড়াকড়ি বাড়বে এবং দেশটিতে ডেটা সেন্টার নির্মাণের গতি কমে যাবে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা প্রযুক্তি শেয়ার ছাড়তে শুরু করেছেন বলে বাজার বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন।
ধসের তীব্রতা এতটাই ছিল যে দক্ষিণ কোরিয়ায় শুক্রবার বাজারের লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। ওই দেশের কসপি সূচকে তীব্র পতন শুরু হলে কর্তৃপক্ষ লেনদেন স্থগিত করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে।
জাপানের নিক্কেই সূচক একদিনে ৬ শতাংশ কমেছে, যা ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর একদিনে সবচেয়ে বড় পতন। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের সূচক লেনদেন শুরুর পরপরই ৮ শতাংশের বেশি পড়ে যায়, পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও দিনের বড় ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
এর আগের রাতে ওয়াল স্ট্রিটেও একই চিত্র দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার রাতে ওয়াল স্ট্রিটের অস্থিরতার ‘ভয়ের সূচক’ লাফিয়ে বেড়ে যায়, প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ পড়ে এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার মুছে যায়। বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উৎসাহ দেওয়া এআই বিস্তারে ডেমোক্র্যাটরা লাগাম টানতে পারে।
বেইজিং থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক ক্যাটরিনা ইউ বলেন, ‘এশিয়ার অনেক বিনিয়োগকারীর জন্য এটা ছিল এক ভয়াবহ সকাল। আমরা দেখেছি, এআই শেয়ার বিক্রির ঢল অনেক দেশজুড়েই অব্যাহত রয়েছে।’ তিনি বলেন, কয়েকটি বড় বাজার পরে ক্ষতির কিছুটা কাটিয়ে উঠলেও সব বাজারই পরিষ্কারভাবে লাল চিহ্নে (ক্ষতিতে) রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক উদ্বেগ এমন এক এআই বাণিজ্যকে আঘাত করেছে, যেটি সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে বিপুল ব্যয়ের প্রত্যাশিত আয় নিয়ে প্রশ্নের মুখে এমনিতেই টলমল অবস্থায় ছিল। অ্যাসেট ম্যানেজার লিংটং শেংতাইয়ের চেয়ারম্যান ডং বাওঝেন রয়টার্সকে বলেন, ‘এই বিক্রির ঢল দেখাচ্ছে, এআই শেয়ারের দাম ভবিষ্যৎ নিয়ে গোলাপি বিভ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, এখন সেই বিভ্রম কেটে গেছে।’
ডং বাওঝেন আরও বলেন, ‘মার্কিন শেয়ারবাজার ছিল বিশ্বজুড়ে এআই ঊর্ধ্বগতির পতাকাবাহী ও মেরুদণ্ড। এখন সেই মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। অন্য কোথাও এআই বাজার কি একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে?’
বাজার সামাল দিতে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থমন্ত্রী লি হিয়ং-ইল খুচরা বিনিয়োগকারীদের লিভারেজ (ধার নিয়ে) বিনিয়োগের নিয়ম শিথিল করেছেন। চীনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার স্থিতিশীল করতে শেয়ার কিনতে এগিয়ে এসেছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদক জানিয়েছেন।
তাইওয়ানের বাজার দিন শেষে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমে বন্ধ হয়, সকালের বড় পতন থেকে কিছুটা উঠে আসে। তবে পুরো সপ্তাহে তাইওয়ানের সূচক ১২ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে—এলএসইজির তথ্য অনুযায়ী ১৯৯১ সালের পর এটি সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সবচেয়ে বড় পতন। চিপ উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র এই দ্বীপরাষ্ট্রের সরকার শুক্রবার এক বিবৃতিতে খাতটির সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে।
কোম্পানিভিত্তিক হিসাবেও পতন ছিল চোখে পড়ার মতো। দক্ষিণ কোরিয়ার এআই চিপ নির্মাতা স্যামসাং ইলেকট্রনিকস প্রায় ৬ শতাংশ ও এসকে হাইনিক্স ৯ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে, যদিও দুটিই দিনের আগের ভাগের আরও বড় পতন থেকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। তাইওয়ানে টিএসএমসি একপর্যায়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত পড়লেও দিন শেষে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ কমে বন্ধ হয়। জাপানে কিয়োক্সিয়া ১১ শতাংশ এবং এআই বিনিয়োগকারী সফটব্যাংক গ্রুপ ১১ শতাংশ পড়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই বিক্রির ঢল দেখাচ্ছে বিনিয়োগকারীরা এখন ডেটা সেন্টারের প্রতি ক্রমবর্ধমান বিরোধিতাকেও হিসাবে নিতে শুরু করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই ইনস্টিটিউটের প্রধান বিজ্ঞানী টবি ওয়ালশ আল জাজিরাকে বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশে ডেটা সেন্টার নিয়ে নতুন নিয়ম আসবে বলে প্রত্যাশা করেন।
ওয়ালশ বলেন, ‘ডেভেলপাররা এমনভাবে ডেটা সেন্টার বানাচ্ছিল, যাতে আসলে সামাজিক লাইসেন্স পাওয়া যায় না। যেখানে বানানোর দরকার নেই, সেখানেই তারা বানাচ্ছিল। ডেটা সেন্টার শহরের ভেতর বানাতেই হবে এমন নয়; জনবসতি থেকে দূরে কোথাও বানানো যায়।’ তাঁর মতে, ‘আমার মনে হয় এটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শিল্পের জন্যই ভালো হয়েছে। আমরা বড্ড দ্রুত টাকা খরচ করছিলাম। হয়তো এভাবেই বুদবুদটি নিয়ন্ত্রণযোগ্যভাবে ফুটো হতে দেওয়া যাবে।’
এদিকে তাইওয়ানের অর্থনীতি মন্ত্রণালয় শুক্রবারের বিবৃতিতে বলেছে, এআই, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ও ক্লাউড সেবার মতো উদীয়মান প্রযুক্তির চাহিদা বাড়তেই থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর চাহিদাকে এগিয়ে নেবে। দিনের শেষভাগে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে এশিয়ার বাজারগুলো ক্ষতির কিছুটা কাটিয়ে উঠেছে, তবে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ কাটেনি।


