সব উপজেলা কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় তোলার সিদ্ধান্তসহ স্বাস্থ্য পুনর্গঠনের সমন্বিত পরিকল্পনা সরকারের
উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, রোগনির্ণয় সুবিধার আধুনিকায়ন ও ক্যান্সার চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনে সমন্বিত পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার।
চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার, যা জাতীয় বাজেটের মোট বরাদ্দের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, ‘১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের দুর্নীতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অব্যবস্থাপনার কারণে আমরা একটি ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা পেয়েছি। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর পর্যাপ্ত সংস্কার হয়নি।’ তিনি বলেন, এ কারণে দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান সরকার দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর পর্যায়ক্রমিক উন্নয়ন এবং সেখানে বিশেষায়িত ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সরকার ৪৪ হাজার ৭৫৭ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পটি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ১৮টি হাসপাতালকে ৫১ শয্যায়, ৩০৫টি হাসপাতালকে ১০১ শয্যায়, ৮৩টি হাসপাতালকে ১৩২ শয্যায়, ১৩টি হাসপাতালকে ১২০ শয্যায়, ৯টি হাসপাতালকে ১৫১ শয্যায় এবং আরও ১৫টি হাসপাতালকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ৪৪৩টি উপজেলায় সমন্বিত বহুতল সেবাভবন নির্মাণ এবং ১৫টি উপজেলায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের জন্য আবাসন সুবিধা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ড. মুহিত বলেন, ‘জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক এলাকার বিদ্যমান ৩০ ও ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো আর পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে কিছু উপজেলা ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে।’ এ কারণে সরকার দেশের সবমিলিয়ে ৫০৩টি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পূর্ণাঙ্গ ১৫১ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরের একটি ‘ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত’ নিয়েছে বলে তিনি জানান।
উন্নীত এসব প্রতিষ্ঠানে নিবিড় পরিচর্যা ও করোনারি কেয়ার, ওয়ান-স্টপ জরুরি সেবা, মেডিসিন, সার্জারি, নাক-কান-গলা, চক্ষু, শিশু, মাতৃস্বাস্থ্য, কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যান্সার স্ক্রিনিং এবং ফিজিওথেরাপি সেবা দেওয়া হবে। পাশাপাশি স্ট্রোক ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের জন্য সেবা এবং প্যাথলজিক্যাল ও অন্যান্য রোগনির্ণয় সুবিধাও থাকবে।
সরকার ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ১৪ হাজার ৬৩৪টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা হাব এবং ১ হাজার ৬৩১টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় ১১ হাজার ৯৯৩ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার আরেকটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত এ প্রকল্পটিও বর্তমানে চূড়ান্তকরণের পর্যায়ে রয়েছে।
প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে প্রশিক্ষিত ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসমৃদ্ধ প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবেন। তারা নিয়মিতভাবে অন্তত প্রতি দুই মাসে একবার মানুষের বাড়ি বাড়ি যাবেন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত পরামর্শ ও সেবা দেবেন। তারা রক্তচাপ ও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করতে পারবেন, যাতে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়। ড. মুহিত বলেন, ‘আমরা শুধু মানুষের দোরগোড়ায় নয়, বরং তাদের ঘরের ভেতরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চাই।’
ড. মুহিতের তথ্যমতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা সংখ্যার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নার্স রয়েছে বাংলাদেশে। সরকার বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে ইতোমধ্যেই ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আরও ২ হাজার ৫০০ নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। মাতৃস্বাস্থ্যসেবা জোরদার ও নিরাপদ সন্তান প্রসব নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ করা হবে। এছাড়া বিদ্যমান ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর পাশাপাশি আরও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে; প্রথম পর্যায়ে ৩০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এছাড়া সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও কিশোরগঞ্জের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে পাঁচটি ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (আইএনএমএএস) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার প্রস্তাবিত ব্যয় ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০৩০ সালের জুন। দেশব্যাপী ক্যান্সার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে ১৭টি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর এবং প্রথমবারের মতো পাঁচটি অত্যাধুনিক রোবোটিক সার্জারি মেশিন কেনার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
সরকার সাভারে একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করছে, যেটিকে বাংলাদেশে এ ধরনের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করেছেন ড. মুহিত। আগামী ১ জানুয়ারি উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি, যেখানে সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ পাবেন।
এছাড়া চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি ও অকেজো যন্ত্রপাতি শনাক্ত করতে সরকার দেশব্যাপী চিকিৎসা সরঞ্জামের নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। ড. মুহিত বলেন, অনেক উপজেলা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে কার্যকর এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিনসহ প্রয়োজনীয় রোগনির্ণয় সরঞ্জামও নেই। স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নয়নে শিগগিরই ১৬ হাজার কোটি টাকার একটি দরপত্র আহ্বান করা হবে, যার আওতায় উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে নির্মাণ, সংস্কার এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হবে।

