কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর ট্রাম্পের সামনে তিন পথ: ভেটো, নির্বাহী আদেশ, নাকি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল আসতে শুরু করার পর মঙ্গলবার গভীর রাতে সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছার কথা বলেছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘তারা ইতিমধ্যে ফোন করেছে, তারা আমার সঙ্গে কাজ করতে চায়। আমার সবকিছুতে ভেটো দেওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু আমি দুই বছর ধরে শুধু বসে বসে সবকিছুতে ভেটো দিতে চাই না।’
এই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলের ঢেউয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি ভেসে গেছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর দুই মেয়াদ মিলিয়ে এই প্রথম রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের কোনো কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণে নেই। কয়েকটি আসনের গণনা বাকি থাকলেও প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা ৪৩৫ আসনের মধ্যে অন্তত ২৫৩টি এবং সিনেটে ১০০ আসনের মধ্যে অন্তত ৫৪টি নিশ্চিত করেছে।
এরপর ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে একটি ছবি পোস্ট করেছেন, যেখানে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ লেখা লাল বেসবল টুপি দিয়ে ‘ভেটো’ শব্দটি সাজানো হয়েছে। মার্কিন সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদের সপ্তম ধারা অনুযায়ী, কংগ্রেসে পাস হওয়া আইন ভেটো দিয়ে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের রয়েছে।
কংগ্রেস সেই ভেটো অগ্রাহ্য করতে পারে, তবে তার জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। ডেমোক্র্যাটদের হাতে কোনো কক্ষেই সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনপ্রণয়নে প্রভাব ফেলতে এখন ট্রাম্পের সামনে তিনটি পথ রয়েছে: আইনে ভেটো দেওয়া, নির্বাহী আদেশ কার্যকর করা, অথবা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করা। পলিটিকোকে দেওয়া তাঁর মন্তব্য ইঙ্গিত করে, তিনি কখন ভেটো দেবেন আর কখন সমঝোতা করবেন—তা বেছে নিতে পারেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্প ২৯২টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন—ফেডারেল রেজিস্টার অনুযায়ী, এর মধ্যে গত বছর ২২৫টি এবং এ বছর ৬৭টি।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের মার্কিন রাজনীতি বিষয়ের প্রভাষক অ্যান্ড্রু প্রক্টর বলেছেন, কংগ্রেসের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের হাতে আগের চেয়ে আরও কম সুযোগ রয়েছে। তাঁর ভাষায়, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সম্ভবত অনেক অচলাবস্থা দেখা যাবে। ডেমোক্র্যাটরা নীতি পাসের চেষ্টা করবে, কিন্তু ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে এবং সেই ভেটো অগ্রাহ্য করার মতো আসন ডেমোক্র্যাটদের নেই। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখলে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে আইন পাসে কাজ করবেন—এমন সম্ভাবনা কম।
তবে কয়েকজন ডেমোক্র্যাট বলেছেন, তাঁদের প্রচারের প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে থাকা কর্মসূচিগুলো এগিয়ে নিতে তাঁরা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কাজ করবেন। মিশিগানের আবদুল এল-সায়েদ, যিনি মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম, ইতিমধ্যে বলেছেন তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন—যদিও প্রচারের সময় ট্রাম্প তাঁকে লক্ষ্য করে বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ব্যবহার করেছিলেন।
বৃহস্পতিবার এমএসএনওকে এল-সায়েদ বলেন, রাজনীতি থেকে অর্থের প্রভাব দূর করা, মানুষের পকেটে অর্থ পৌঁছে দেওয়া এবং সবার জন্য মেডিকেয়ার পাস করার বিষয়ে ট্রাম্প আগ্রহী হলে তিনি সেটাই করতে নির্বাচিত হয়েছেন এবং যারা তা করতে ইচ্ছুক, তাদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি উন্মুখ। তিনি বলেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তিনি হবেন একজন মার্কিন সিনেটর; স্বাস্থ্যসেবা, মেডিকেয়ার কাটছাঁট বন্ধ, যুদ্ধ ও কানাডার সঙ্গে শুল্কের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে আলোচনা হতে পারে।
প্রগতিশীল সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলোতে বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষেই সবার জন্য মেডিকেয়ার বিল পাস করলে ট্রাম্প তাতে সই করবেন—এমন সম্ভাবনা তিনি উড়িয়ে দেন না। ট্রাম্পকে তিনি এমন একজন রাজনীতিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যিনি খুব বেশি মতাদর্শগত নন।
প্রক্টরের মতে, ট্রাম্প নিজেকে ভালো দেখাবে—এমন ভিত্তিতে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে চুক্তি করতে পারেন, তবে আগামী দুই বছরে সবার জন্য মেডিকেয়ার পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাঁর মতে, স্বাস্থ্যসেবায় যেখানে অভিন্ন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে, তা হলো ট্রাম্পের আগের আইনে কাটা ভর্তুকিগুলো ফিরিয়ে আনা, যাতে লাখ লাখ আমেরিকানের জন্য স্বাস্থ্যসেবা আরও সাশ্রয়ী হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালে কয়েকজন রিপাবলিকান স্বাস্থ্য সংস্কার নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।
ভেটো ব্যবহারের কথা বললেও ট্রাম্প ঐতিহাসিকভাবে এই ক্ষমতার সবচেয়ে আগ্রহী ব্যবহারকারীদের একজন নন। এই মেয়াদে তিনি এখন পর্যন্ত দুইবার ভেটো দিয়েছেন, প্রথম মেয়াদে দিয়েছিলেন ১০ বার। জো বাইডেন তাঁর এক মেয়াদে ১২ বার এবং বারাক ওবামা দুই মেয়াদে ১২ বার ভেটো দিয়েছিলেন। বিল ক্লিনটন ১৯৯৩ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে ৩৭ বার, তাঁর পূর্বসূরি জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এক মেয়াদে ৪৪ বার এবং রোনাল্ড রিগ্যান দুই মেয়াদে ৭৮ বার ভেটো দিয়েছিলেন।
প্রক্টর আরও বলেছেন, আইন আটকাতে রিপাবলিকানদের হাতে আরেকটি হাতিয়ার রয়েছে—ফিলিবাস্টার, অর্থাৎ বর্ধিত বিতর্কের মাধ্যমে কোনো আইনের ওপর ভোট বিলম্বিত করা। তাঁর মতে, সিনেট রিপাবলিকানরা সম্ভবত একই কাজ করার চেষ্টা করবে, যাতে আইন ট্রাম্পের কাছে পৌঁছানোর আগেই আটকে যায় এবং ভেটোর প্রশ্নই না ওঠে।
মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবিও উঠতে শুরু করেছে। প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া, যিনি হাউস ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছেন, এক্সে লিখেছেন, ‘আইনজীবী তৈরি রাখুন।’ সিনেট অর্থ কমিটির নেতৃত্ব দিতে যাওয়া সিনেটর রন ওয়াইডেন এক্সে লিখেছেন, ‘সাবপোয়েনা।’
তবে ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে কোনো অন্যায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র লরেন বিস বুধবার বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা যদি ভুয়া তদন্ত ও চরম বাম নীতি বেছে নেয়, তবে তারা আমেরিকান জনগণের বিরুদ্ধে কাজ করাকেই বেছে নিচ্ছে। প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া আসন্ন হতে পারে; ট্রাম্প ও অন্য রিপাবলিকানরা দলের হারের জন্য এই যুদ্ধকেই দায়ী করেছেন।



