ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ হলেন স্টিফেন মিলার, অভিবাসন অভিযান আরও কঠোর হওয়ার শঙ্কা

মঙ্গলবার ভোটাররা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার নৃশংস গণ-নির্বাসন অভিযানকে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু শুক্রবার প্রেসিডেন্ট উল্টো পথে হাঁটলেন। তিনি তার প্রশাসনের সবচেয়ে আগ্রাসী অভিবাসন নীতিগুলোর স্থপতি স্টিফেন মিলারকে চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিলেন।
মিলারের এই পদোন্নতিকে একটি অশুভ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত দুই বছরে ট্রাম্প যে নির্বাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন, তা এখন পুরো গতিতে এগিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মিলার ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই তার পাশে থাকা একজন উদ্যোগী অভিবাসন-বিরোধী প্রচারক। তিনিই সবচেয়ে বেশি দায়ী এ বছর ও গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে চালানো সহিংস অভিবাসন অভিযানের জন্য। তার নির্দেশনায় মুখোশ পরা ও সামরিক পোশাকধারী এজেন্টরা আবাসিক এলাকায় ঢুকে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের গ্রেপ্তার করেছে। তিনি বৈধ অভিবাসনও প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছেন।
এর আগে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ও নীতি উপদেষ্টার দায়িত্বে থেকে মিলার ট্রাম্পের পাশেই ছিলেন এবং প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে চরম প্রবণতাগুলোকে উসকে দিয়েছেন।
টেক্সাসভিত্তিক মানবিক সহায়তা ও অভিবাসন সেবা সংস্থা রাইসেসের সহ-প্রধান নির্বাহী ফয়সাল আল-জুবুরি বলেন, 'স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ পদে উন্নীত করা প্রশাসনের নিষ্ঠুরতম প্রবণতাগুলোকে আরও জোরদার করার সংকেত দেয়। মিলারের পদোন্নতি গণ-নির্বাসন ত্বরান্বিত হওয়া এবং আমাদের পাড়ায় পাড়ায় নৃশংস শক্তি প্রয়োগের নিশ্চয়তা দেয়।'
মিনিয়াপলিসে অভিবাসন অভিযানের সময় এজেন্টদের গুলিতে নার্স অ্যালেক্স প্রেটি নিহত হওয়ার পর ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিলারই ধারণা দিয়েছিলেন যে ট্রাম্প সামরিক বাহিনী পাঠাতে ইনসারেকশন অ্যাক্ট প্রয়োগ করতে পারেন।
মিলারই এলিয়েন এনিমিজ অ্যাক্ট ব্যবহারের আইনি কাঠামো তৈরি করেন, যার মাধ্যমে আশ্রয়প্রার্থীসহ ভেনেজুয়েলার অভিবাসীদের ট্রেন দে আরাগুয়া কার্টেলের সঙ্গে যুক্ত বিদেশি সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে সালভাদরের একটি বৃহৎ কারাগারে পাঠানো হয় এবং ছোট ছোট ভেনেজুয়েলার নৌকায় হামলা চালানো হয়।
ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনে মিলারই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা 'মুসলিম ব্যান' তৈরি করেন। তিনিই তৈরি করেন কুখ্যাত জিরো টলারেন্স নীতি, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে ৫ হাজার ৬০০-র বেশি শিশুকে তাদের বাবা-মা ও অভিভাবকদের কাছ থেকে আলাদা করা হয়। সম্প্রতি তিনি অনথিভুক্ত শিশুদের নির্বাসন ত্বরান্বিত করার জন্য চাপ দিচ্ছেন।
মিলারের বয়স ৪১ বছর। তিনি নিজে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ইহুদি অভিবাসীদের বংশধর এবং উদারপন্থী সান্তা মনিকা, ক্যালিফোর্নিয়ায় বেড়ে উঠেছেন। পরে তিনি নিজের শহরকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ক্যালিফোর্নিয়াকে গণ-অভিবাসনের কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি ব্যর্থ রাজ্য হিসেবে দেখতে শুরু করেন। একসময় তিনি অভিবাসনকে ঐতিহ্যবাহী যুক্তরাষ্ট্রের তার ধারণাকে দুর্বল করার একটি বামপন্থী ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
ট্রাম্পের পাশে এক দশকের বেশি সময় ধরে থেকে মিলার চরম নির্বাহী ক্ষমতা অর্জন, কংগ্রেস ও বিচার বিভাগকে দুর্বল করা এবং তদারকি অমান্য করার কাজ করেছেন—যার বেশির ভাগই তার অভিবাসন-বিরোধী অভিযানকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এক অভিনন্দনমূলক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বলেন, 'তিনি কখনো পিছু হটেন না,' আর মিলারকে একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক বলে অভিহিত করেন।
কংগ্রেস, গভর্নরদের কার্যালয় ও রাজ্য আইনসভার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের আগামী দুই বছরের বেশির ভাগ সময় মিলারের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যয় করতে হতে পারে। মানবাধিকার কর্মী ও অভিবাসীদের পক্ষের আইনজীবীরা ইতিমধ্যে কংগ্রেস সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন মিলারকে থামাতে সবকিছু করার জন্য।
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া, যিনি আগামী বছর হাউস ওভারসাইট কমিটির নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন, সতর্ক করে বলেন মিলারের 'আইনজীবী নিয়োগ করা উচিত'। তিনি মিলার ও প্রশাসনের গণ-নির্বাসন পরিকল্পনায় তার জড়িত থাকার বিষয়ে তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন।
সিনেটর অ্যালেক্স পাডিলা বলেন, ট্রাম্প যদি দ্বিগুণ জোরে এগিয়ে যান, 'আমরাও তাই করব'। তিনি 'আমাদের হাতে থাকা প্রতিটি হাতিয়ার—তদারকি, তদন্ত, সমন এবং ফেডারেল তহবিলের ওপর আমাদের প্রভাব—ব্যবহার করে এই প্রশাসনের ক্ষমতার অপব্যবহার উন্মোচন ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার' প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে কংগ্রেসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকলেও ডেমোক্র্যাটদের অভিবাসন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সীমিত হতে পারে। এসব সংস্থা ২০২৯ সাল পর্যন্ত ৭০ বিলিয়ন ডলার তহবিল পেয়েছে। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট তাদের কর্মীসংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়াতে প্রস্তুত। অভিবাসন গ্রেপ্তার ও আটক ইতিমধ্যে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
২০১৮ সালে মিলার একটি চুক্তি ভেস্তে দিয়েছিলেন বলে জানা যায়, যার মাধ্যমে সীমান্ত প্রাচীরের জন্য ট্রাম্প ২৫ বিলিয়ন ডলার তহবিল পেতেন, বিনিময়ে শিশু অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে আসা অনথিভুক্ত অভিবাসীদের স্থায়ী সুরক্ষার বিধান থাকত।
তার নীতিগুলো ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে নির্বাচিত করা ভোটার জোটকে—বিশাল সংখ্যক লাতিনো ভোটারসহ—দূরে সরিয়ে দিয়েছে বলে মনে হলেও, তা তাকে বিচলিত করেনি। ভোটারদের প্রতিক্রিয়াও তাকে থামাতে পারবে বলে মনে হয় না। আল-জুবুরি বলেন, 'এটি তাকে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর আরও বড় ক্ষমতার অবস্থানে বসিয়েছে।'


