পুরোনো ভিডিওকে রংপুরের ঘটনা বলে প্রচার, আসল ঘটনা রাজবাড়ীর নুরাল পাগলার
রংপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক নেতার মরদেহ কবর থেকে তুলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়; এটি গত বছরের রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে আগুন দেওয়ার ঘটনার ভিডিও।
‘সুরিয়া ভাই’ নামের একটি ফেসবুক পেজে গত ৫ নভেম্বর একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা রয়েছে, ‘রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির মৃত লাশ কবর থেকে উঠিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল জামায়াত-শিবিরের পাকিস্তানি দালালেরা’।
৭ নভেম্বর দুপুর ১টা পর্যন্ত ভিডিওটি প্রায় ২ লাখ ১৯ হাজার বারের বেশি দেখা হয়েছে। এছাড়া পোস্টটিতে কয়েক হাজার রিয়েকশন ও শেয়ার রয়েছে।
পোস্টটির কমেন্ট পর্যালোচনা করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। পোস্টের কমেন্টে একজন লিখেছেন, ‘অতি উৎসাহিত হয়ে কোন কিছু করা ঠিক না। মানুষ মরে গেলে তার লাশের সাথে কিসের শত্রুতা।’ আরেকজন বলেন, ‘এদের ভবিষ্যতে কি হবে এক আল্লাহ জানেন।’ অন্য একজন আবার কমেন্ট করেন, ‘এটা নুরা পাগলার লাশ আগের ভিডিও।’
ছড়িয়ে পড়া ৪৮ সেকেন্ডের ভিডিওতে কয়েকজনকে মাটি খুঁড়ে একটি মরদেহ তুলতে দেখা যায়। পরে সেটি কফিনে করে নিয়ে যাওয়া হয়। ভিডিওর শেষের দিকে আগুনের দৃশ্য রয়েছে।
প্রথমে প্রচারিত ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। অনুসন্ধানে ‘দ্য নিউজ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর পোস্ট করা একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ‘একেবারে মাটি খুঁড়ে নুরাল পাগলের লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলার চাঞ্চল্যকর ভিডিও’ ক্যাপশনে প্রকাশিত ওই ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওটির মিল রয়েছে।
এছাড়া, গত বছর প্রায় একই ক্যাপশনে পোস্ট করা আরও কয়েকটি ভিডিওর সঙ্গেও আলোচিত ভিডিওটির মিল পাওয়া যায়।
প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড দিয়ে আরও অনুসন্ধানে বিবিসি বাংলার ফেসবুক পেজেও গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর শেয়ার করা একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটির ক্যাপশনে বলা হয়, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলা হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির দরবারে হামলা এবং কবর থেকে মরদেহ তুলে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছিল।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি বাংলার ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘রাজবাড়ীতে কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দিল বিক্ষুব্ধ জনতা’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলকে মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে বেদি তৈরি করে দাফন করা হয়েছিল। এটি শরিয়ত পরিপন্থী দাবি করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে উত্তেজিত জনতা কবর থেকে তাঁর মরদেহ তুলে পদ্মার মোড় এলাকায় আগুন ধরিয়ে দেয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর এ ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের দুটি ডবল কেবিন পিকআপ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শরীফ আল রাজীব ঘটনাটির তথ্য নিশ্চিত করেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে নিজ বাড়িতে দরবার গড়ে তুলেছিলেন নুরুল হক। ১৯৯৩ সালের ২৩ মার্চ মুচলেকা দিয়ে তিনি এলাকা ছাড়েন। পরে আবার দরবারে ফিরে কার্যক্রম শুরু করেন। গত ২৩ আগস্ট বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় তাঁর মৃত্যু হয়। ওই দিন রাতে দুই দফা জানাজা শেষে তাঁকে মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে বিশেষ কায়দায় দাফন করা হয়। কবরের বেদি পবিত্র কাবার আদলে রং করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া, ঘটনাটি নিয়ে আরও কয়েকটি জাতীয় দৈনিকেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনেও ঘটনাস্থল হিসেবে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে যাচাইয়ে স্পষ্ট হয়েছে, রংপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক নেতার মরদেহ কবর থেকে তুলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়। প্রকৃতপক্ষে, ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে আগুন দেওয়ার ঘটনার ভিডিও এটি। পুরোনো ওই ভিডিওকে রংপুরের সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও কয়েকটি যাচাই-না-করা দাবিও ছড়িয়ে পড়েছে—জুমার নামাজের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের দাবিতে একটি ভিডিও, পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে আশুলিয়ায় ৮ শ্রমিক এবং হেমায়েতপুরে ৫ শ্রমিক নিহত হওয়ার দাবি, এবং রাঙামাটির সাজেকে গোলাগুলির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা ‘জুম্মা লিবারেশন আর্মি (জেএলএ)’ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি। এসব দাবির সপক্ষে যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।




