স্থাপত্য ও চিত্রে পুরান ঢাকার কাব্যময়তা: রফিক আজমের একক প্রদর্শনী 'থ্রেশহোল্ড'
স্থপতি রফিক আজমের একক প্রদর্শনী 'থ্রেশহোল্ড: আর্ট অ্যান্ড আর্কিটেকচার' চলছে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান প্রদর্শনকক্ষে। পুরান ঢাকার স্মৃতিবাস্তবতার কাব্যময়তা উঠে এসেছে তাঁর রেখাচিত্র, জলরঙ, আলোকচিত্র ও স্থাপত্যের মডেলে।
গত শুক্রবার ছুটির দিনের বিকেলে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম। আলোচক হিসেবে ছিলেন স্থপতি অধ্যাপক শামসুল ওয়ারেস ও স্থপতি জালাল আহমেদ। স্থপতি রফিক আজম তুলে ধরেন তাঁর শিল্পভাবনা। প্রদর্শনীটি কিউরেট করেছেন বিশিষ্ট শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান ও তাইয়্যেবা বেগম লিপি। প্রদর্শনীটি চলবে আগামী ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত।
দ্রুত রেখার টানে আঁকা নৌকার সারি থেমে আছে নদীর তীরে। আরও আছে পুরান ঢাকার দরদালান। দূর থেকে দেখা মসজিদের মিনার-গম্বুজ। জলরঙের আলো-আঁধারির রহস্যময়তা। এসবের পাশেই আছে আধুনিক স্থাপত্যের আলোকচিত্র ও স্থাপত্যের মডেল। সব মিলিয়ে উঠে এসেছে পুরান ঢাকার স্মৃতিবাস্তবতার কাব্যময়তা।
প্রদর্শনকক্ষে প্রবেশ করলেই সামনের দেয়ালে বড় আকারের একটি বোর্ডে চোখে পড়বে স্থাপত্যের নকশা। পাশের দেয়ালগুলোতে রয়েছে কালি-কলমে আঁকা রেখাচিত্র।
স্থপতি রফিক আজমের জন্ম পুরান ঢাকার লালবাগে। ঢাকার পরিবর্তন তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বৃক্ষবিহীন রুক্ষ নাগরিক দৃশ্যপট—এসবই উঠে এসেছে তাঁর ছবিতে। ঘরবাড়ির ওপর দিয়ে টানা বিদ্যুতের তার, পুরান ঢাকার প্রাচীন দালানকোঠার অংশবিশেষ, ছাদের কার্নিশ, খিলান ও প্রাচীর—সবই আছে তাঁর রেখাচিত্রে।
রফিক আজমের আঁকা রেখাচিত্রে আরও আছে নদীতীরের নৌকা। নৌকার নানা গড়ন এঁকেছেন তিনি। সামনে, পেছনে কিংবা পাশ থেকে দেখা নৌকার অবয়ব ধরা পড়েছে তাঁর ছবিতে। রিকশাও আছে। হাতে টানা পুরোনো দিনের রিকশা থেকে প্যাডেল রিকশা—সবই এঁকেছেন তিনি। আছে ঢেউখেলানো শাখা-প্রশাখা মেলে থাকা গাছপালাও।
জলরঙের কাজগুলো অনেকটা বিমূর্ত রীতির। সেখানে আছে সাদা-কালোর রহস্যময়তা। এ ছাড়া প্রদর্শনীতে রয়েছে ব্যক্তিগত বসতবাড়ি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভবনের স্থাপত্যনকশা। আছে সেসব ভবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা আলোকচিত্র ও স্থাপনার মডেল। বুড়িগঙ্গার পাশ দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারিত ঢাকা নগরীর বিশালতার চিত্রও স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে।
প্রদর্শনকক্ষের মেঝের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে তাঁর স্থাপত্যের মডেল, খসড়া নকশা, নকশার খাতা ও লেখালেখির খাতা নিয়ে তৈরি একটি স্থাপনাশিল্প। কক্ষের দক্ষিণ পাশের দেয়ালজুড়ে প্রদর্শিত হচ্ছে স্থপতি রফিক আজমের একটি ভিডিও চিত্র। সেখানে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর স্থাপত্য ও শিল্পভাবনার অভিজ্ঞতা।
স্থপতি রফিক আজম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ায়। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এটি তাঁর তৃতীয় একক প্রদর্শনী। এর আগে ২০০৮ সালে 'নেচার ইজ' এবং ২০১৪ সালে 'ওয়াটার ইন লাইট' শিরোনামে তাঁর দুটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
এ ছাড়া রফিক আজমের কাজ ও ভাবনা নিয়ে ইতালির বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা স্কিরা ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে 'আর্কিটেকচার ফর গ্রিন লিভিং' নামের গ্রন্থ। স্থাপত্যকর্মের জন্য 'লিডিং ইউরোপিয়ান আর্কিটেক্ট' পুরস্কারসহ দেশে-বিদেশে অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন স্থপতি রফিক আজম।


