মধ্যবর্তী নির্বাচনে এআইপিএসি সমর্থিত অনেক প্রার্থী জিতলেও বেশির ভাগ অর্থ গেল পরাজিতদের পেছনে
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইসরায়েলপন্থি লবি গোষ্ঠী এআইপিএসি ও এর সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ব্যয় গোষ্ঠীগুলো কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে। গোষ্ঠীটির সমর্থিত অনেক প্রার্থী জিতলেও খরচ করা মোট অর্থের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গেছে পরাজিত প্রার্থীদের পেছনে।
টেক্সাস থেকে সিনেটে আসন জয়ের প্রায় এক বছর আগে জেমস টালারিকো এআইপিএসি থেকে প্রচারের অর্থ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নজর কেড়েছিলেন। এক পডকাস্টের ক্লিপে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কখনো এআইপিএসি থেকে অর্থ নিইনি, আর এই প্রচারেও নিচ্ছি না।’ গাজায় যা ঘটছে তা দেখে তাঁর মন খারাপ হয় বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
৩ নভেম্বর টালারিকো ১২ শতাংশের বেশি ব্যবধানে জয়ী হন। এআইপিএসির সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কেন প্যাক্সটনকে প্রায় ৬ হাজার ডলারের সামান্য সহায়তা দিয়েছিল।
দেশজুড়ে বিভিন্ন আসনে এআইপিএসি ও এর সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো এক প্রার্থী বা অন্য প্রার্থীর পেছনে কয়েক কোটি ডলার ঢেলেছে। গোষ্ঠীটি অনেক বিজয়ী প্রার্থীকে সমর্থন দিলেও নির্বাচনী চক্রে খরচ করা মোট অর্থের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গেছে হেরে যাওয়া প্রার্থীদের পেছনে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্র্যাফটের হিসাবে, এআইপিএসি, ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট (ইউডিপি) ও যুক্ত গোষ্ঠীগুলো এই নির্বাচনী চক্রে ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার খরচ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার গেছে জেতেননি এমন প্রার্থীদের পেছনে।
তবে জয়ী প্রার্থীর সংখ্যার হিসাবে গোষ্ঠীটির রেকর্ড এখনো শক্তিশালী। নির্বাচনের পরদিন ৪ নভেম্বর এআইপিএসি জানায়, তাদের সমর্থিত প্রায় ২৩৪ জন প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।
ট্র্যাক এআইপিএসির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০টি পিএসি গোষ্ঠীটির সঙ্গে যুক্ত। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ৩৫টি সিনেট আসনের মধ্যে অন্তত ৩২টিতে ইসরায়েলপন্থি গোষ্ঠীগুলো প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি আসনে একেকজন প্রার্থীর পেছনে ১ লাখ ডলারের বেশি খরচ করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে ২১ জন ৩ নভেম্বর জয়ী হন।
সাবেক জ্যেষ্ঠ রিপাবলিকান কংগ্রেস সহকারী ও ভূরাজনৈতিক উপদেষ্টা রিনা শাহ বলেন, কয়েক বছর আগেও বেশির ভাগ রিপাবলিকান প্রার্থীর জন্য এআইপিএসির সমর্থন নেওয়া ছিল সহজ সিদ্ধান্ত। এখন তরুণ ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধারার প্রার্থীরা বিদেশি জড়িত থাকা নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তুলছেন, আর গাজা সব ধারার ভোটারদের মনে প্রভাব ফেলছে।
এআইপিএসি কীভাবে অর্থ খরচ করে, তা আরও অস্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। অক্টোবরে গোষ্ঠীটি জানায়, এই নির্বাচনী চক্রের পর তারা প্রার্থীদের সমর্থন ও সরাসরি অনুদান দেওয়া বন্ধ করবে। এর বেশির ভাগ ব্যয় ইতিমধ্যে ইউডিপির মতো অনুমোদিত সুপার পিএসির মাধ্যমে হয়, ফলে অনুদান অনুসরণ করা কঠিন।
এআইপিএসি সমর্থিত প্রার্থীর হারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আসন ছিল মিশিগানের সিনেট আসন। সেখানে গোষ্ঠীটি ও অনুমোদিত পিএসিগুলো প্রতিনিধি হ্যালি স্টিভেন্সের পেছনে প্রায় ৩ কোটি ডলার খরচ করে। এরপর রিপাবলিকান মাইক রজার্সের পেছনে আরও ৯০ লাখ ডলার ঢালা হয়। রজার্স ৩ নভেম্বর আব্দুল এল-সায়েদের কাছে হেরে যান। এল-সায়েদ ইসরায়েলের সমালোচক এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
নির্বাচনের রাতে বিজয়ী ভাষণে এল-সায়েদ ইসরায়েলপন্থি লবি গোষ্ঠীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনাকে দুইবার হারানোর সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।’
মেইনে এআইপিএসির সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো সিনেটর সুসান কলিন্সের পুনর্নির্বাচনী প্রচারে ৪৮ লাখ ডলারের বেশি সহায়তা দেয়। কলিন্স ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসনের কাছে হেরে যান।
ক্যালিফোর্নিয়ায় মেলিসা হার্নান্দেজ ইউডিপি ও অন্যান্য ইসরায়েলপন্থি গোষ্ঠী থেকে ৬০ লাখ ডলারের বেশি সহায়তা পান। তিনি প্রতিনিধি পরিষদের আসনে আফগান আমেরিকান আইশা ওয়াহাবকে হারাতে চেয়েছিলেন। ওয়াহাব জয়ী হন।
তবে কিছু আসনে গোষ্ঠীগুলো সফলভাবে প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছে, বিশেষ করে প্রাথমিক নির্বাচনে। মিসৌরিতে এআইপিএসির সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো প্রতিনিধি ওয়েসলি বেলের পেছনে প্রায় ৩০ লাখ ডলার দেয়। বেল ৩ নভেম্বর ৮১ শতাংশের বেশি ভোটে জয়ী হন। এর বেশির ভাগ অর্থ প্রাথমিক নির্বাচনে খরচ হয়, যেখানে বেল সাবেক প্রতিনিধি কোরি বুশকে হারান। ২০২৪ সালে বুশকে হারাতে এআইপিএসির সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো ৮০ লাখ ডলার ঢেলেছিল।
নিউইয়র্কে জর্জ ল্যাটিমার পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৪ সালে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামাল বোম্যানকে হারাতে এআইপিএসি প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার খরচ করেছিল। ইউডিপি ২০২৪ সালে আরেকটি প্রাথমিক নির্বাচনে সারা এলফ্রেথকে জেতাতে ৪০ লাখ ডলারের বেশি খরচ করে। এলফ্রেথ ৩ নভেম্বর আবার জয়ী হন।
এআইপিএসি এখন ইসরায়েল বিষয়ে একমাত্র লবি গোষ্ঠী নয়। ইহুদি আমেরিকান গোষ্ঠী জে স্ট্রিট ৪ নভেম্বর জানায়, তারা ২০০ জনের বেশি প্রার্থীকে ১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ দিয়ে সমর্থন করেছে। জে স্ট্রিটের কমিশন করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৭২ শতাংশ আমেরিকান ইহুদি ভোটার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করেছেন।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি বলেন, ‘আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছি।’ তাঁর ভাষায়, শুধু এআইপিএসি লাখ লাখ ডলার খরচ করে হারছে, তা নয়; এখন প্রার্থীরা এআইপিএসির অনুদানকে বিষাক্ত মনে করে তা প্রত্যাখ্যান করছেন।



