সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেন নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকট, সামনে কঠিন জোট-অঙ্ক

ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ শনিবার বিরোধীদলীয় নেতা গাদি আইজেনকটকে দেশের পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময় এলো, যখন গত ২৭ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
হারজগ শনিবার তাঁর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তরের অনুষ্ঠান হবে রোববার, ৮ নভেম্বর, ইসরায়েল সময় বিকেল ৫টায়। এরপর আইজেনকট সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন, প্রয়োজনে আরও ১৪ দিনের বাড়তি সময়ও মিলতে পারে।
ইসরায়েলের নবনির্বাচিত পার্লামেন্ট কনেসেটের সঙ্গে দুই দিনের আলোচনার পর বৃহস্পতিবার হারজগ জানান, কনেসেটের ১২০ সদস্যের মধ্যে ৬৭ জন আইজেনকটকে সরকার গঠনের জন্য সুপারিশ করেছেন। নেতানিয়াহুর পক্ষে সুপারিশ করেছেন ৪৬ জন আইনপ্রণেতা। আর অতি-অর্থোডক্স ইউনাইটেড তোরাহ জুডায়িজম পার্টির সাত সদস্য কোনো প্রার্থীর পক্ষেই সুপারিশ করেননি।
গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ দল একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ২৭টি আসন পেয়েছে। তাঁর বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুকে সরাতে চাওয়া চার দলের জোট পেয়েছে মাত্র ৪৮টি আসন।
আইজেনকটের পক্ষে সুপারিশ করা ৬৭ জনের বাকি অংশ এসেছে আরব নেতৃত্বাধীন দুটি দল—জয়েন্ট লিস্ট ও রা'আম—থেকে। এই দুটি দলের হাতে মোট ১৯টি আসন রয়েছে। দুটি দলই প্রেসিডেন্টের কাছে আইজেনকটের নাম সুপারিশ করলেও তাঁদের সমর্থন আইজেনকটের সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের জন্য দ্বিধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ তাঁদের কেউ কেউ আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিষয়টি আগেই নাকচ করে দিয়েছেন।
শুক্রবার এক দীর্ঘ বিবৃতিতে আইজেনকট তাঁর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি যাকে 'জাতীয় জরুরি সরকার' বলছেন, তা প্রথমে গড়ে উঠবে নেতানিয়াহুকে সরাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ চারটি দলকে নিয়ে। তবে অন্য দল ও আইনপ্রণেতাদের যোগ দেওয়ার দরজাও খোলা রাখার কথা বলেছেন তিনি।
'ইসরায়েল একটি সত্যিকারের, বাস্তব ও বিপজ্জনক জাতীয় জরুরি অবস্থার মুখোমুখি,' বলেন আইজেনকট। তিনি বিদায়ী সরকারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলার অভিযোগ তোলেন এবং সতর্ক করে দেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতে থাকলে দেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও গভীর হতে পারে।
তাঁর প্রস্তাবিত সরকার চারটি মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়াবে। সেগুলো হলো: ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি; ইসরায়েলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধ মেনে নেওয়া; সবার জন্য সামরিক, জাতীয় বা বেসামরিক সেবা; এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তার সামরিক ও শাসনক্ষমতা ভেঙে দেওয়ার অঙ্গীকার।
জোট গঠনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে শুক্রবার। ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী ইসরায়েল বেইতেনু দলের নেতা আভিগদোর লিবারম্যান অতি-অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক বাধ্যতামূলক নিয়োগ নিয়ে আপসের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই বিষয়ে তাঁর এতদিনের অনড় অবস্থান ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতার পথ বন্ধ করে রেখেছিল।
এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে লিবারম্যান বলেন, আরেকটি নির্বাচন ঠেকাতে এবং নেতানিয়াহুর সময় শেষ করতে হলে কঠিন রাজনৈতিক আপস করতেই হবে। তিনি তিনটি শর্তের কথা বলেন: নেতানিয়াহুর যুগের অবসান, আরেকটি নির্বাচন এড়ানো এবং জয়েন্ট লিস্ট ও রা'আমের ভোটে নির্ভর করে সরকার না গড়া।
ইউনাইটেড তোরাহ জুডায়িজমের নেতা ইয়াকভ আশের শুক্রবার লিবারম্যানের নমনীয়তাকে স্বাগত জানালেও বলেন, তাঁর দল এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পায়নি এবং যেকোনো চুক্তির জন্য ধর্মীয় নেতৃত্বের অনুমোদন লাগবে।
সংখ্যার হিসাব আইজেনকটের জন্য এখনো কঠিন। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ৬১টি আসন। ইউনাইটেড তোরাহ জুডায়িজমকে চার দলের বিরোধী জোটে নিলেও আসন দাঁড়াবে ৫৫টিতে, অর্থাৎ এখনো ৬১ থেকে কম। ছয় আসনের ধর্মীয় শাস পার্টি প্রেসিডেন্টের কাছে নেতানিয়াহুর নাম সুপারিশ করেছে।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো জোটের বাইরের দলগুলোর ভোটদানে বিরত থাকার সহায়তায় সংখ্যালঘু সরকার গঠন। আইজেনকটের মিত্ররা এই বিকল্প নিয়ে আলোচনা করলেও লিবারম্যান স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করে এমন সরকার তিনি মানবেন না।
এদিকে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি নির্বাচনের ফলাফলের কিছু দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি ৫ নভেম্বর জানিয়েছে, নির্বাচনের সততায় কোনো আপস হয়নি।
প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পাওয়া আইজেনকটের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মাইলফলক। কিন্তু এই ব্যাপক সংসদীয় সমর্থনকে কার্যকর সরকারে রূপ দিতে হলে সামরিক সেবা ও আরব আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সহযোগিতার মতো ইসরায়েলের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোতে বিভক্ত দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা করতেই হবে। সেই বিভাজন মেটাতে না পারলে ইসরায়েল আরও রাজনৈতিক অচলাবস্থার মুখে পড়তে পারে—এমনকি আরেকটি নির্বাচনও হতে পারে।


