মাদক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগে ১০ আইনজীবীর লিগ্যাল নোটিশ, ১৫ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা দাবি
দেশে মাদকদ্রব্যের অবৈধ অনুপ্রবেশ, পাচার, সরবরাহ, অপব্যবহার ও ক্রমবর্ধমান বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন ১০ জন আইনজীবী।
রোববার (৮ নভেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এ লিগ্যাল নোটিশটি পাঠান।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানস্বীকৃত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলে এতে জানানো হয়।
নোটিশে বলা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন ও মাদকদ্রব্যের ব্যবহার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ রাষ্ট্রের অন্যতম সাংবিধানিক দায়িত্ব। অথচ দেশে মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশ, বিস্তার ও পাচার প্রতিরোধে বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে।
নোটিশে এ প্রসঙ্গে কয়েকটি উদ্বেগজনক তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতার চিত্রটি উল্লেখযোগ্য। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে উদ্ধার-সংক্রান্ত ১ লাখ ২২ হাজার ৪২২টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ১৩৬টি — যা মোট মামলার ১১ শতাংশ মাত্র। এর মধ্যে খালাস পেয়েছেন ৫৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ আসামি।
এ পরিস্থিতি মাদক মামলার তদন্ত, প্রসিকিউশন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের অবতারণা করে বলে নোটিশে বলা হয়েছে।
সীমান্তে রেকর্ড পরিমাণ উদ্ধারের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে নোটিশে। ২০২৫ সালে শুধু সীমান্ত এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ১৪ কোটি ৭০ লাখের বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে।
এছাড়া ২০২৬ সালের এপ্রিলে নাফ নদীতে একক অভিযানে বিজিবির ইতিহাসে এক দিনে সর্বোচ্চ ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এসব পরিসংখ্যান দেশে মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশ ও সরবরাহের ব্যাপকতা নির্দেশ করে।
আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে নোটিশে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’, ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ ও ‘গোল্ডেন ওয়েজ’-এর মতো আন্তর্জাতিক মাদক রুটের ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাগামী কোকেন পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবেও বাংলাদেশের ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নোটিশ গ্রহীতাদের নোটিশ প্রাপ্তির ১৫ দিনের মধ্যে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে — বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সংশোধন করা; বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, র্যাব, কাস্টমস ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি স্থায়ী যৌথ গোয়েন্দা ও সমন্বয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা।
এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মাদকদ্রব্যের অবৈধ লেনদেন ও সরবরাহ প্রতিরোধে বিশেষায়িত সাইবার মনিটরিং ইউনিট গঠন অথবা বিদ্যমান ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত মামলার তদন্তের গুণগত মান উন্নয়ন, উচ্চ হারে খালাসের কারণ নিরূপণ এবং মামলার দীর্ঘসূত্রিতা দূরীকরণে সময়াবদ্ধ ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করার দাবিও জানানো হয়েছে নোটিশে।
মাদকবিরোধী জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়, মাদকদ্রব্যের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বিস্তার রোধ করা কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নয়; বরং এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, নাগরিকের নিরাপত্তা এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা অব্যাহত থাকার সুযোগ নেই।
নির্ধারিত ১৫ দিনের মধ্যে উল্লিখিত দাবিসমূহের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে জনস্বার্থে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়েরসহ প্রয়োজনীয় আইনগত প্রতিকার চাওয়া হবে বলে নোটিশে জানানো হয়েছে।

