আমদানির চাপে অস্থির ডলার, এক সপ্তাহে দাম বাড়ল প্রায় এক টাকা

দীর্ঘদিন ১২০ থেকে ১২২ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল থাকার পর আবারও বাড়তে শুরু করেছে ডলারের দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে আমদানি দায় মেটাতে প্রতি ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় এক টাকা।
বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মধ্যে লেনদেনে প্রতি ডলারের দর ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সা। আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তিতে কোথাও কোথাও দাম উঠেছে ১২৪ টাকা ৯০ পয়সার বেশি। খোলাবাজারে প্রতি ডলার কিনতে গুনতে হচ্ছে ১২৮ টাকারও বেশি।
জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অন্যান্য পণ্য আমদানির দায় মেটাতে বাড়তি ডলারের প্রয়োজন হওয়ায় বাজারে এই চাপ তৈরি হয়েছে। এর বিপরীতে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়লেও ডলারের জোগান চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের তথ্যেও আমদানি ও রপ্তানির আয়ের ব্যবধান বাড়ার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৯৩৩ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই ব্যয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ।
বিপরীতে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৭ শতাংশ। এ সময়ে রপ্তানি থেকে এসেছে ১ হাজার ১৮৬ কোটি ডলার। ফলে তিন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৪৭ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল ৫৭১ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ১৭৬ কোটি ডলার।
আমদানি ব্যয়ের এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা জ্বালানি পণ্যের। প্রথম প্রান্তিকে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪২২ কোটি ডলারের বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ব্যয় ছিল ২০৬ কোটি ডলারের কম। অর্থাৎ এক বছরে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১০৫ শতাংশের বেশি।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনার কারণে এই ব্যয় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। এলএনজির আমদানি দায় পরিশোধেও বাড়তি ডলার প্রয়োজন হচ্ছে।
জ্বালানির পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিও ডলারের বাজারে চাপ বাড়াচ্ছে। প্রথম তিন মাসে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ খাতে খরচ হয়েছে ১৪০ কোটি ডলার।
সামনে রমজানকে কেন্দ্র করে ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল ও ছোলার মতো পণ্যের জন্য ব্যবসায়ীরা নতুন এলসি খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে ডলারের চাহিদা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা। অন্যদিকে মূলধনি পণ্য আমদানি কমেছে ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ উৎপাদন ও বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত মূলধনি পণ্যের আমদানি কমলেও ভোগ্যপণ্য ও জ্বালানিতে ব্যয় বাড়ছে।
ডলারের জোগান বাড়াতে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা আমদানি ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৮৫৯ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আয় বেড়েছে ১৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। তবে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির হার রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি।
এর প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে। প্রথম প্রান্তিকে চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩৩ কোটি ডলার, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৮২ কোটি ডলার। সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও ১১৬ কোটি ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ৮৫ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল।
বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়াতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বুধবার নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ১২ কোটি ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সা। তবে রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করেও বাজারের চাপ পুরোপুরি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। সর্বশেষ হিসাবে, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ৩৪ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
ডলারের দাম বাড়ার প্রবণতা নিয়ে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠকে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোর নিট ওপেন পজিশন (এনওপি) ইতিবাচক থাকার পরও ডলারের দাম এতটা বাড়ার কথা নয়। সংকটের অজুহাতে কোনো পক্ষ যাতে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ডলারের দাম বাড়ানোর পেছনে যৌক্তিক কারণের বাইরে সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকারদের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খোলাবাজারে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে মানি চেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এম এস জামান বলেন, ব্যাংকসহ সব জায়গায় ডলারের দাম বেড়েছে। হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করেন তিনি।
আসন্ন রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও বাজারে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ১০টি পণ্য আমদানিতে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব পণ্য আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে নগদ মার্জিন ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।




