জুলাই সনদ নিয়ে সাত মাসে ১৮ বার প্রতারণার অভিযোগ হাসনাত আবদুল্লাহর
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বিএনপি সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর দাবি, সনদের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন না করে গত সাত মাসে ১৮ বার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বিএনপি।
রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে এবি পার্টির আয়োজনে ‘জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার এক বছর সালতামামি’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় তিনি এই অভিযোগ করেন। অনুষ্ঠানে জুলাই সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, গণভোটের মাধ্যমে ৩০০ সংসদ সদস্যকে ১৮০ দিনের জন্য সংবিধান সংস্কারের যে ক্ষমতা জনগণ দিয়েছিল, তা কাজে লাগানো হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফলের একাংশ মেনে নেওয়া হলেও গণভোটের ফলাফল উপেক্ষা করা হয়েছে। সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথও নেননি। ফলে জুলাই সনদ কার্যত আলঙ্কারিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি বারবার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে সনদে যেসব প্রস্তাব ছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক বিষয়গুলো পরিবর্তন করা হলে ভবিষ্যতে তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। অতীতে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে হাইকোর্টের কয়েকটি বেঞ্চ বিভাগীয় শহরে স্থানান্তরের উদ্যোগ আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে বাতিল হয়েছিল বলেও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
তাঁর প্রশ্ন, ভবিষ্যতে প্রস্তাবিত সংশোধনীও আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে না, তার নিশ্চয়তা কী? এ কারণে সংবিধান সংস্কারের জন্য পৃথক সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে তাঁদের অবস্থান ছিল। জনগণের দেওয়া ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করা উচিত ছিল বলে তিনি মনে করেন।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন সংশোধনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করার অভিযোগও তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, জুলাই সনদে দুদক আইনের ৩৩(ক) ধারা বিলুপ্ত করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো অঙ্গীকার করেছিল। সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করতে সরকারের পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা দূর করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে সেটি আইনে পরিণত করেনি বলে তাঁর অভিযোগ।
দুদকের চেয়ারম্যানের পরিবারের সদস্যের ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের পরামর্শক ব্যবসাসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রম গড়ে উঠছে। এ ধরনের পরিস্থিতি স্বার্থের সংঘাত ও দুর্নীতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জুলাই সনদের ৬৯ নম্বর প্রস্তাবে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের কথা ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, পুলিশের বিরুদ্ধে নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ছিল। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
পুলিশের বদলি ও পদায়নে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কিংবা পুলিশ সুপার (এসপি) পদে পদায়ন পেতেও বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি দাবি করেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ জানান, জুলাই সনদের ৬৭ নম্বর প্রস্তাবে হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগ পৃথক করে সরকারি নিরীক্ষা কার্যক্রমের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি না থাকলেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।
সনদের ৬২ নম্বর প্রস্তাবে তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের কথাও ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, নাগরিকেরা যাতে সহজে সরকারি তথ্য পেতে পারেন এবং সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করা যায়, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করে সরকার স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ থেকে সরে এসেছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন এবং সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর আহ্বান জানান।




