কানাডার সামরিক ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণের সময় ভয়াবহ আগুন: চার সেনা নিহত, ১৯ জনের অবস্থা সংকটাপন্ন
কানাডার আলবার্টা প্রদেশের একটি সামরিক ঘাঁটিতে অগ্নিকাণ্ডে চার সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও কয়েক ডজন ব্যক্তি আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৯ জনের অবস্থা গুরুতর সংকটাপন্ন। রোববার (১৮ অক্টোবর) স্থানীয় সময় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এ তথ্য জানিয়েছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার কানাডিয়ান ফোর্সেস বেস ওয়েনরাইটের প্রশিক্ষণ এলাকায় আগুনের সূত্রপাত হয়। কানাডার ভূখণ্ডে শান্তিকালীন সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে ঘটনাটিকে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
অটোয়ায় সাংবাদিকদের কার্নি বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে চার সেনাসদস্যের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের এ খবর জানানো হয়েছে।’ আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি।
রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মকর্তারা জানান, আহতদের মধ্যে ১৯ জনের অবস্থা গুরুতর সংকটাপন্ন। আরও আটজনের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। চিকিৎসা নেওয়ার পর ১২ জন আহত ব্যক্তি চলাফেরা করতে পারছেন।
কানাডার জাতীয় প্রতিরক্ষা বিভাগের তথ্যমতে, শনিবার বিকেল ৪টার দিকে ঘাঁটির প্রশিক্ষণ এলাকায় আগুন লাগে। মেজর জেনারেল ওয়েড রাটল্যান্ড জানান, আলবার্টার প্রেইরি অঞ্চলে খোলা জায়গায় সামরিক প্রশিক্ষণ চলাকালে সেনাসদস্যরা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনের কবলে পড়েন।
তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে অত্যন্ত দ্রুত। প্রথমে কোথাও আগুন দেখা না গেলেও মাত্র ৩০ সেকেন্ড থেকে এক মিনিটের মধ্যে আগুন সেনাসদস্যদের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।’ রাটল্যান্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুনের উৎপত্তি হয়েছিল প্রশিক্ষণ এলাকার ভেতরে। পরে তা নির্ধারিত সুরক্ষাবেষ্টনী অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তকারীদের অন্তত এক মাস সময় লাগতে পারে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ধারণায় দাবি করা হয়, গোলাবারুদের আঘাতে হাইড্রোকার্বন পরিবহনকারী পাইপলাইনে বিস্ফোরণের ফলে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে এ সম্ভাবনা নাকচ করে রাটল্যান্ড বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে তেল-গ্যাস অবকাঠামো কিংবা বাইরে থেকে কোনো হস্তক্ষেপের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে না।’
তিনি আরও জানান, প্রাথমিক পরিদর্শনে তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর কোনো ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। অন্যদিকে ওয়েনরাইটের পৌর প্রশাসন জানিয়েছে, প্রবল বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেন, ‘আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সামরিক ও বেসামরিক কর্মীরা সারা রাত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করেছেন।’ সহকর্মী ও অন্য কানাডীয় নাগরিকদের রক্ষায় তারা নিজেদের জীবন বিপন্ন করেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কানাডার অন্যতম বৃহৎ সামরিক স্থাপনা ওয়েনরাইট ঘাঁটিতে নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়। ন্যাটোভুক্ত বিভিন্ন দেশের সেনাসদস্যরাও এসব প্রশিক্ষণে অংশ নেন।
এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন ন্যাটোর সামরিক কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল জিউসেপ কাভো দ্রাগোনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি নিহত সেনাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। তিনি বলেন, ‘ওয়েনরাইট এমন একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, যেখানে কানাডীয় সেনাদের পাশাপাশি মিত্রদেশগুলোর সামরিক সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নেন।’ ন্যাটোর ৩২টি সদস্যদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানরা কানাডা ও দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর পাশে রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
অগ্নিকাণ্ডের পর আহতদের চিকিৎসা দিতে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে ব্যাপক চাপের মুখে পড়তে হয়। ঘাঁটি থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এডমন্টন শহরের একটি হাসপাতালের চিকিৎসক ওয়ারেন থির্স্ক কানাডার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসিকে জানান, আহত রোগীর সংখ্যা সামাল দিতে ওয়েনরাইট এলাকার স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছিল।
কার্নি বলেন, ‘আহত সেনাসদস্যদের সুস্থ হয়ে ওঠার প্রতিটি পর্যায়ে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে সরকার পাশে থাকবে।’ একই সঙ্গে শোকাহত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ারও আশ্বাস দেন তিনি। এখন তদন্তের দিকেই সবার নজর—প্রশিক্ষণ এলাকায় কীভাবে এত দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ল, তা জানতে অন্তত এক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে।





