হুথি হামলার মুখে পিছিয়ে গেল সৌদির ‘মরুভূমির দাভোস’, ২০২৬-এর বিনিয়োগ সম্মেলন স্থগিত
ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধাদের প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত থাকায় সৌদি আরব তার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ সম্মেলন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (এফআইআই) ২০২৬ সালে আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্মেলনটি আগামী বছর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে বলে আয়োজক প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্মেলনটি শুরু হওয়ার কথা ছিল আগামী সপ্তাহে, ২৬ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। কিন্তু মঙ্গলবার প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগামী বছরের নতুন তারিখ ‘খুব শিগগিরই’ ঘোষণা করা হবে। ফলে দশম সংস্করণ হিসেবে চিহ্নিত এই আয়োজনটি এ বছর আর হচ্ছে না।
এফআইআই ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মাহা বিনতে মিশারি আল সৌদ বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত এসেছে অংশীদার, সদস্য, বক্তা ও প্রতিনিধিদের প্রতি গভীর অঙ্গীকার থেকে। তাঁর ভাষ্যে, ‘এটি আমাদের মাইলফলক দশম সংস্করণ বলে আমরা নিশ্চিত করতে চাই, এটি যেন সেই পূর্ণ মাত্রা, অসাধারণ মান ও অবিস্মরণীয় প্রভাব দিতে পারে, যা আমাদের সম্প্রদায় প্রত্যাশা করে এবং সত্যিকার অর্থে যার যোগ্য।’
এই সম্মেলনটি অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘মরুভূমির দাভোস’ নামে পরিচিত — সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের সঙ্গে তুলনা করেই এই নাম। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এই সম্মেলনে সৌদি আরব তার উচ্চাভিলাষী বিনিয়োগ পরিকল্পনা তুলে ধরে, যার লক্ষ্য জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন, খেলাধুলা ও প্রযুক্তির দিকে অর্থনীতিকে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা।
এফআইআইয়ের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এবারের আয়োজনে বক্তা হিসেবে অংশ নেওয়ার কথা ছিল অ্যালফাবেট ও গুগলের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান তথ্য কর্মকর্তা রুথ পোরাট, গোল্ডম্যান স্যাকস গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ডেভিড সলোমন এবং ব্ল্যাকরকের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী লরেন্স ফিঙ্কের মতো বিশ্ব ব্যবসায়ের শীর্ষ নামগুলোর। এত বড় মাপের অতিথি তালিকাই বলে দেয়, সম্মেলনটি স্থগিত করা রিয়াদের জন্য কতটা বড় সিদ্ধান্ত।
স্থগিতের পেছনের কারণ যুদ্ধ পরিস্থিতি। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে লড়া সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং ইরান-ঘনিষ্ঠ হুথিদের মধ্যে সংঘাত সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তীব্র আকার নিয়েছে। হুথিরা, যারা আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত, রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সৌদি আরবজুড়ে সামরিক, জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছেন।
হামলার প্রভাব পড়েছে রাজধানী রিয়াদের দৈনন্দিন জীবনেও। বারবার হামলার মুখে শহরের সরকারি সংস্থাগুলো কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে বলে একজন কর্মী ও দুজন পরামর্শক বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন।
রিয়াদের কেন্দ্রে অবস্থিত ৯৯ তলা কিংডম সেন্টার, যেখানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আঞ্চলিক কার্যালয়ও রয়েছে, সেখানকার কর্মীদেরও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অফিসে না আসতে বলা হয়েছে।
রোববার রাজধানীর একটি সরকারি সংস্থার এক কর্মচারী বার্তা পান, ‘এই সপ্তাহে সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দূরবর্তী কাজ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ বার্তায় আরও বলা হয়, ‘আমরা সবাইকে স্বাভাবিকভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে অনুরোধ করছি।’
শুধু সরকারি খাত নয়, কিং আবদুল্লাহ ফাইন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্ট, যেখানে বড় বড় মার্কিন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় রয়েছে, সেখানকার কোম্পানিগুলোও কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করতে বলেছে বলে অন্যান্য সূত্র জানিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে হাজারো আন্তর্জাতিক অতিথিকে রিয়াদে এনে বিশ্বমানের সম্মেলন আয়োজন করা যে সম্ভব নয়, সেটাই আয়োজকদের সিদ্ধান্তে স্পষ্ট। এখন সবার দৃষ্টি দুটি দিকে — হুথি হামলা কবে থামে এবং আগামী বছরের নতুন তারিখ কবে ঘোষণা করা হয়।





